চট্টগ্রামে সড়কে চলছে সাড়ে ২২ হাজার অবৈধ যানবাহন

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৫৩

চট্টগ্রামে পরিবহন সেক্টরে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। গত ১০ বছরে চট্টগ্রামে সাড়ে ২২ হাজার যানবাহনের ফিটনেস নবায়ন করা হয়নি, যেগুলোর মধ্যে গণপরিবহনের গাড়িই বেশি। ত্রুটিপূর্ণ এসব গাড়ির অধিকাংশই বর্তমানে সড়কে চলাচল করছে। মালিকরা বিআরটিএতে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করছে না। ট্রাফিক পুলিশও এদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফিটনেস নবায়ন না করায় প্রতি বছর সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আর আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে এক শ্রেণির পরিবহন মালিক সমিতির নেতা ও পুলিশ। দেখা যায়, বিআরটিএর ম্যাজিস্ট্রেট কোনো সড়কে মোবাইল কোর্ট করলে সড়ক গাড়িশূন্য হয়ে পড়ে। পরে সড়কে আবার এসব অবৈধ গাড়ির দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।

যানবাহনগুলোকে শৃঙ্খলায় আনার জন্য সরকার মালিকদের নানাভাবে সময়, সুযোগ দিচ্ছে। জরিমানা ছাড়াই গাড়ির কাগজপত্র, লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস নবায়নের সুযোগ দিচ্ছে, তারপরও এসব সুযোগ নিচ্ছে না অসাধু পরিবহন মালিকরা। এ বিষয়টিকে কটাক্ষ করে কেউ কেউ বলেন, ‘তারা সড়কে ম্যানেজ করে গাড়ি চালাতে পছন্দ করে, কিন্তু বিআরটিএতে যায় না।’

বিআরটিএ জানায়, চট্টগ্রামে ২২ হাজার ৬৫৫টি যানবাহন গত ১০ বছর যাবত্ ফিটনেস নবায়ন করছে না। এসব যানবাহনের জন্য গত জুন থেকে চলতি ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সব ধরনের গাড়ির কাগজপত্র আপডেট করার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে করলে জরিমানা দিতে হবে না। তারপরও তেমন সাড়া মিলছে না। বিআরটিএর সহকারী পরিচালক তৌহিদুল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, গাড়ির কাগজপত্র আপডেট করা চলমান প্রক্রিয়া। তারপরও চলতি  ডিসেম্বর পর্যন্ত জরিমানা ছাড়াই সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া মিলছে না। পরিবহন মালিকরা করোনার কারণে তাদের ব্যবসায় লস হচ্ছে বলে অজুহাত দেখাচ্ছে।’

ট্রাফিক পুলিশ জানায়, ত্রুটিপূর্ণ কাগজযুক্ত যানবাহনের বিরুদ্ধে তারা প্রতিদিন শতশত মামলা দিচ্ছেন। পরিবহন মালিক ও চালকরা জরিমানার টাকা পরিশোধ করছেন। গত অক্টোবর মাসে সিএমপিতে বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে জরিমানা বাবদ ট্রাফিক বিভাগে এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে, মামলা হয়েছে ৯ হাজার। এত মামলা নিয়েই সড়কে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনগুলো চলাচল করছে। সিএমপির উপকমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) মো. শহীদুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে কাগজপত্র আপডেট করার জন্য চলতি ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে প্রতিদিন মামলা দিচ্ছে। ডিসেম্বরের পর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা যায়, নতুন আইনে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা অনাধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয় দফায় মামলায় ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে নতুন আইনটি এখনো পরোপুরি কার্যকর হয়নি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘কিছু অসাধু পরিবহন ব্যবসায়ী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। তারা গাড়ির ডকুমেন্ট আপডেট করছে না। তারা সরকারের কর ফাঁকি দিচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের উচিত ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা।

পরিবহন সেক্টরে প্রতিটি রুটে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নতুন নতুন সংগঠন জন্ম নিচ্ছে। এসব সংগঠনের নামে চলছে চাঁদাবাজি। জানা যায়, চট্টগ্রামে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের প্রায় ১০০টি সংগঠন রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বিরোধ। সংগঠনগুলোর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন রুটে ফিটনেস ও রুট পারমিট ছাড়াই চলছে গণপরিবহন। সংগঠনের নেতারা পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এই কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য বিআরটিএতে দুই জন ম্যাজিস্ট্রেট কর্মরত রয়েছেন। তারা বিভিন্ন রুটে অভিযান চালাচ্ছেন। জানতে চাইলে বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নুরে-ই- জামান জানান, অভিযানে দেখা যায়, শুধু ফিটনেসবিহীন যানবাহনই নয়, অধিকাংশ গাড়ির রেজিস্ট্রেশনও ভুয়া। এ ধরনের অসংখ্য গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। শহরের মধ্যে গণপরিবহনের বেশির ভাগ গাড়িকেই এক রুটের পারমিট নিয়ে অন্য রুটে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। সড়কে মোবাইল কোর্টের খবর পেলেই ত্রুটিপূর্ণ গাড়িগুলো উধাও হয়ে যায়।’

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে গণপরিবহনে ছোট  যানবাহনের দৌরাত্ম্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবহন মালিক গোলাম হোসেন বাবুল বলেন, ‘পটিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এলাকার মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে টেম্পো, জীপ ও সিএনজি অটোরিকশার দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বা রুট পারমিট কিছুই নেই। কীভাবে চলছে পুলিশই ভালো বলতে পাবে। প্রতিনিয়ত সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অলি আহমেদও বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন সড়কে যেসব টেম্পো ও ম্যাক্সিমা চলছে সবগুলোই অবৈধ। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ব্যস্ততম সড়কে সিএনজি অটোরিকশা, ম্যাক্সিমাসহ ছোট আকৃতির গাড়ি চলাচলের বিরুদ্ধে তারা। কিন্তু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ইন্ধনে গাড়িগুলো চলাচল করায় ব্যবস্থা নিতে পারছে না পুলিশ।