মাধব রায়
গল্পকার-প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক
ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
গতকালের পর
বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ গভীর রাতেই সারা পৃথিবীর মানুষের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বক্তব্য দেন। ঘোষণাটি ইপিআর এর ট্রান্সমিটার, টেলিগ্রাম ও টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে সারাদেশে প্রচার করা হয়। ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার খবর শুনে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ভীষণভাবে বিদ্রোহী হয়ে উঠেন। তখন তিনি পাকিস্তানের কারাকোরাম এলাকায় ১৭৩ ইঞ্জিনিয়ার্স ব্যাটেলিয়নে কর্মরত ছিলেন। চেষ্টা করতে লাগলেন কী করে পালানো যায়। জাহাঙ্গীর এর বন্ধু ক্যাপ্টেন হামিদ এর সহযোগিতায় আরও তিনজন অফিসারের সাথে যোগাযোগ হলো। এঁরাও পালাতে চান। তাঁরা হলেন ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন, মেজর শাহরিয়ার ও লে. কর্নেল আনাম। এদের মধ্যে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন পরবর্তীতে যুদ্ধে শহিদ হন এবং বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত হন। জাহাঙ্গীর এর সাথে আগে অন্য তিনজনের পরিচয় ছিল না। হলে কী হবে, তাদের শরীরে যে বইছে একই বাংলা মায়ের রক্ত।
এদিকে চারজন বাঙালি সামরিক অফিসার সুদূর পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছে দেশের মুক্তি সংগ্রামে যোগ দেয়ার জন্য, এই খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং লক্ষ লক্ষ বাঙালি এতে অনুপ্রাণিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের চিফ কমান্ডার কর্নেল এমএজি ওসমানী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এই বীরদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য কলকাতায় চলে এলেন।
কলকাতা থেকে চারজন যোদ্ধাকে বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হয়। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে পাঠানো হয় সবচেয়ে বেশি যুদ্ধবিক্ষুব্ধ ৭নং সেক্টরে, মেহেদীপুর ক্যাম্পে। ছাড়াছাড়ি হবার সময় জাহাঙ্গীর বলেছিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা অংশ নেয়, তাদের মধ্যে খুব কম লোকই বেঁচে থাকে। অনেকেই স্বাধীনতার ফল ভোগ করে যেতে পারে না, যারা পারে তারা ভাগ্যবান। আমার সৌভাগ্য না-ও হতে পারে। কিন্তু তাকে কিছু আসবে যাবে না। যদি বাঁচি আবার দেখা হবে।
৭নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল নুরুজ্জামান। মহিউদ্দিনকে একটি সাবসেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি তাঁর সাবসেক্টরকে নিজের মতো করে তৈরি করে নেন। মেহেদীপুরের সবচেয়ে কাছের শত্রু ঘাঁটি কানসাট। তিনি কানসাট অপারেশন সফলভাবে পারিচালনা করেন। এর পরের অপারেশন ছিল পাকিস্তানিদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি শাহপুর। সেই ঘাঁটিও মহিউদ্দিন সফলভাবে দখল করতে সক্ষম হন। এভাবে একের পর এক যুদ্ধে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বীরত্বের প্রমাণ দিয়ে শত্রুপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে থাকেন এবং শত্রুঘাঁটি দখলমুক্ত করতে থাকেন।
এদিকে পাকসেনারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখল করে বসে আছে। শান্তিকামী নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্যাতন চালিয়ে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে দিচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল নুরুজ্জামান এর নেতৃত্বে তিনটি দল গঠিত হয়। প্রথম দলের নেতৃত্বে মেজর গিয়াস, দ্বিতীয় দলের নেতৃত্বে মেজর রশীদ, তৃতীয় দলের নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। প্রথম দলের ওপর দায়িত্ব দেয়া হলো সড়ক অবরোধ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে রাজশাহী থেকে বিচ্ছিন্ন করা। সবচেয়ে কঠিন এবং দুঃসাহসী কাজটি দেয়া হলো তৃতীয় দল, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখল করা। ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১, ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর, লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম, লেফটেন্যান্ট আউয়ালসহ প্রায় ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘরিয়ায় অবস্থান নেন। পরিকল্পনা হলো, ভারতীয় অফিসার বিগ্রেডিয়ার প্রেম সিং এর নেতৃত্বে ১১ ডিসেম্বর বারঘরিয়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদীর ওপারে উঁচু বাঁধের ওপর শত্রুঘাঁটিতে আর্টিলাটির গোলা নিক্ষেপ করবে। এতে শত্রু সেনারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে এবং দুর্বল হয়ে যাবে। সাথে সাথে ক্যাপ্টন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বীরদর্পে আক্রমণ চালিয়ে সেই ঘাঁটি দখল করবে। কিন্তু অজানা কারণে সেইদিন ভারতীয় বাহিনী শত্রুসেনাদের ওপর গোলা বর্ষণ করেনি। মহিউদ্দিন ১২ এবং ১৩ ডিসেম্বর অনেক চেষ্টা করেও ভারতীয় বাহিনীর সাথে ওয়ারলেস যোগাযোগ করতে পারেননি। তিনি এতদূরে এসে আক্রমণ না করে ফিরে যাবার পক্ষপাতী ছিলেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতীয় বাহিনীর আর্টিলারি কাভার ছাড়াই আক্রমণ করে ফেলবেন। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, ২০ জনের মতো সহযোদ্ধা নিয়ে সকাল ৮ টার দিকে রেহাইচর এলাকা দিয়ে ৩-৪টি নৌকায় করে মহানন্দা নদী পার হলেন মহিউদ্দিন ও তাঁর দল। এরপর শত্রুদের সাথে হাতাহাতি ও সম্মুখযুদ্ধ শুরু হলো। ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হলো সেই যুদ্ধ। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন উত্তরদিক থেকে শত্রু হনন করতে করতে দক্ষিণ দিকে যেতে লাগলেন। পরের অংশ আগামীকাল
