বাহন

হাইপারলুপ—সময় এখন হাতের মুঠোয়

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮:৫৪

মইনুল হাসান

ধূমায়িত কফির কাপে শেষ চুমুকটি দিতেই ৩৫ মিনিটে সানফ্রানসিসকো থেকে ৬০০ কিলোমিটার অর্থাত্ প্রায় ৩৭৩ মাইল দূরত্বের লসঅ্যাঞ্জেলেস পৌঁছে গেলে কেমন হতো? এক ফাঁকে খবরের কাগজেও চোখ বুলিয়ে নেওয়া যেতে পারত। হাইপারলুপ প্রযুক্তি খাটিয়ে তা সম্ভব।

এমনটাই ভেবেছিলেন ২০১৩ সালে স্পেসএক্স এবং টেসলারপ্রধান মার্কিন ধনকুবের এলন মাস্ক। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অচিরেই আবুধাবি থেকে ১২ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যাবে দুবাই, প্রায় ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মাইল) পথ। নয়াদিল্লি বা মুম্বাই থেকে কলকাতা যেতে লাগবে মাত্র এক ঘণ্টা। বসে নেই প্রযুক্তিবিদরা। তাঁর এমন যুগান্তকারী ধারণা লুফে নিল দেশ-বিদেশের উদ্যোক্তারা।

বিশেষজ্ঞরা একমত যে হাইপারলুপ ভ্রমণ হবে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ, নিশ্চিত, নিঃশব্দ, জ্বালানি সাশ্রয়ী, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং স্বল্প খরচের। আর আবহাওয়া যেমনি থাকুক তাতে কোনো সমস্যা হবে না। পৃথিবীর দ্রুততম রেলগাড়ির গতির চেয়ে তিনগুণ বেশি গতিতে চলতে পারবে। সেসব কারণেই এমন উন্নত প্রযুক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ—তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, কানাডা এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ।

প্রায় বায়ুশূন্য একটি টিউবের মধ্যে থাকবে চাকা বা পায়া বিহীন, অনেকটাই ভেসে থাকা যাত্রী বা পণ্যসহ ক্যাপসুল। ফলে কোনো প্রকার ঘর্ষণ হবে না এবং বাতাসের চাপ এবং বাধা খুবই কম হবে। আর সেইসঙ্গে চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যাবে। টিউবের মধ্যে ক্যাপসুলের গতি হবে সুপারসনিক অর্থাত্ শব্দের গতির চেয়েও বেশি, ঘণ্টায় ৭৫০ মাইল বা ১২০০ কিলোমিটার। বিমানের গতির প্রায় দ্বিগুণ। বিদ্যুত্ হবে এর মূল চালিকাশক্তি। দীর্ঘ যে টিউব বা টানেলের মধ্যে দিয়ে এই ক্যাপসুলটি চলাচল করবে, সেই টিউবের উপরিভাগে বসানো সৌর প্যানেল থেকে আসবে সে শক্তি।

বেশ কিছু সংস্থা বা কোম্পানি তড়িঘড়ি করে এমন প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে অগ্রণী হয়েছে সেই ২০১৩ সাল থেকেই। তবে এর মধ্যে এক পা এগিয়ে আছে ভার্জিন হাইপারলুপ ওয়ান। ৮ নভেম্বর ২০২০ পরিবহনের ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় উন্মোচিত হলো। এদিন নেভাদারার লাসভেগাসে ভার্জিন হাইপারলুপ প্রথমবারের মতো আয়োজন করেছিল মানবযাত্রীসহ হাইপারলুপের যাত্রা। মাত্র পনেরো সেকেন্ডের এই যাত্রায় জোশজিগেল এবং সারালুচিয়ান একইসঙ্গে ছিলেন এই নতুন ধরনের পরিবহনে। ৫০০ মিটার দীর্ঘ এবং ৩.৩ মিটার ব্যাসের পরীক্ষামূলক ট্রাকে গতি উঠেছিল ঘণ্টায় ১৭২.৮ কিলোমিটার অর্থাত্ ১০৭ মাইল। ভার্জিন হাইপারলুপ এবং ডিপিওয়ার্ল্ডের গ্রুপপ্রধান সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আরো দীর্ঘ ট্রাকে খুব সহজেই মানুষবাহী ক্যাপসুলের গতি ঘণ্টায় ৯০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ওঠার ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। ভার্জিন হাইপারলুপ এর আগে ৪০০বার মানুষ বিহীন পরীক্ষা চালিয়েছে।

আজ থেকে ১০০ বছরের বেশি আগে সেই ১ জানুয়ারি ১৯১৪-তে বিশ্বের প্রথম নির্ধারিত যাত্রী বিমান পরিষেবা চালু হয়েছিল। তখন মানুষ অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে সময়কে জয় করার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তাকিয়েছিল আকাশের দিকে। ভার্জিন হাইপারলুপের মানুষবাহী ক্যাপসুলের প্রথম পরীক্ষামূলক পরিবহনের সফলতায় আবারও একবার বিস্মিত হবার পালা—সময় এখন হাতের মুঠোয়।