আফগানিস্তানে নতুন শান্তি উদ্যোগ

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:২৭

এম এ আলআমিন

 

আফগান সরকার ও তালেবান প্রতিনিধিরা দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে একটি খসড়া চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। ১৯ বছরের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে দুই পক্ষ এই প্রথম একটি লিখিত চুক্তি করল। ২ ডিসেম্বর কাবুলে এ সম্পর্কিত চুক্তিটি সই হয় বলে জানা গেছে। আফগান সরকার ও তালেবান উভয় তরফে এ খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

এটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নয়। তবে এটি শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। উভয় পক্ষের মধ্যে বহু বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তালেবান মিলিশিয়ারা এখন তাদের সরকারি টার্গেটে হামলা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। চুক্তি সইয়ের পর আফগান সরকারের একজন প্রতিনিধি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছি। আশা করি এর ওপর ভিত্তি করে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারব। এখন এজেন্ডা ধরে আলোচনা শুরু হবে।’ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান প্রতিনিধিদের মধ্যে মাসের পর মাস ধরে যে আলোচনা চলেছে এই চুক্তি তার একটি সফল পরিণতি। দেশটিতে সহিংসতার মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে না কমলেও যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, আলোচনা চালিয়ে যেতে উভয় পক্ষের অভিন্ন ইস্যু নির্ধারণ করাকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানায়। তিনি আরো বলেন, আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা ও একটি কার্যকর অস্ত্রবিরতির জন্য তার দেশ উভয় পক্ষের সঙ্গে কাজ করে যাবে।

আফগানিস্তানে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি কার্যকর অস্ত্রবিরতি। সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়েও তালেবান এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির মুখপাত্র সাদিক সিদ্দিকী বলেন, ‘(এই চুক্তি) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা শুরুর ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ। একটি সর্বাত্মক অস্ত্রবিরতি চুক্তি এখন আফগান জনগণের দাবি।’ আফগানিস্তানবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ বলেছেন, তিন পৃষ্ঠার চুক্তিতে উভয় পক্ষ কতগুলো জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করতে একমত হয়েছে। যা একটি সর্বাত্মক অস্ত্রবিরতি চুক্তি ও রাজনৈতিক রোডম্যাপের পথ সুগম করতে পারে। শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের একটি হলো উপসাগরীয় দেশ কাতার অপরটি প্রতিবেশী পাকিস্তান। উভয় দেশ বিশেষ করে পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনী তালেবানকে আলোচনার টেবিলে বসতে চাপ সৃষ্টি করেছে। দুটি দেশই সদ্য সম্পাদিত চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। কাতার এ ঘটনাকে এক ‘মাইলফলক’ আখ্যা দিয়েছে।

তালেবান মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে ২০০১ সালের শেষের দিকে ক্ষমতাচ্যুত হয়। ঐ বছর ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করার পর অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরু করে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মাথায় তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হলেও তারা এখনো একটি প্রভাবশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়ে গেছে। আফগানিস্তানের অনেক এলাকা এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে। এমতাবস্থায় শান্তি প্রচেষ্টা এগিয়ে নিয়ে বদ্ধপরিকর এখন কাবুল ও ওয়াশিংটন। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে দোহায় দুই পক্ষের মধ্যে (যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান) প্রথম অস্ত্রবিরতি চুক্তি হয়। ১৯ বছরের মধ্যে প্রথম সরাসরি বৈঠকে শান্তির জন্য আশাবাদ ব্যক্ত করে দুই পক্ষই। ঠিক হয়েছিল তালেবান সহিংসতা বন্ধ করবে এবং ২০২১ সালের মে মাসের মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়বে সব মার্কিন সৈন্য। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য চেয়েছিলেন এ বছর বড়দিনের আগেই সব সৈন্য দেশে ফিরিয়ে আনতে। সব সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়ার পরও দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা ও জরুরি প্রয়োজনে আড়াই হাজার সৈন্য থাকবে। ব্রিটেন ও জার্মানি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে আফগানিস্তানে এখনো সৈন্য প্রত্যাহারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সেখানে যে মাত্রার সহিংসতা হচ্ছে তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। বাস্তবতা হলো দেশটিতে অন্তহীন সহিংসতায় পশ্চিমারা হতাশ। তারা এই অন্তহীন যুদ্ধের একটি পরিসমাপ্তি দেখতে চায়। তবে তার জন্য একটি পরিবেশ তৈরি হোক। ২৪ নভেম্বর জেনেভায় অনুষ্ঠিত আফগানিস্তানবিষয়ক দাতা দেশগুলোর সম্মেলনে ১২ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আগামী চার বছরে দেওয়া হবে এই অর্থ। তবে শর্ত দেওয়া হয়েছে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে।