নৌযান চলাচলে বাধা কম উচ্চতার
২৩ সেতু, রয়েছে নাব্যসংকটও
মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লার গোমতী নদীপথে বাংলাদেশ-ভারত নৌ-বাণিজ্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের গত ৫ সেপ্টেম্বর উত্সবমুখর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গোমতী নদী দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত নৌরুটে পণ্য পরিবহন উদ্বোধন করা হলেও নদীর ওপর ছোট-বড় কম উচ্চতার ২৩টি সেতু ও নদীর বিভিন্ন স্থানে নাব্য সংকটের কারণে বর্তমানে নৌযানে বাণিজ্য থমকে আছে। তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বলেছে, নৌযান চলাচলের উপযোগী করতে গোমতী নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে হবে, এজন্য নদী খননে ৩১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গোমতী নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের ডুমুর নামক স্থানে উত্পন্ন হয়ে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার সর্পিল পথ অতিক্রম করে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার, বিবিরবাজার, গোলাবাড়ী হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর নদীটি আঁকাবাঁকা প্রবাহপথে কুমিল্লার বুড়িচং, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, তিতাসের বুক চিরে প্রবাহিত হয়ে দাউদকান্দি উপজেলার শাপটা নামক স্থানে এসে মেঘনা নদীতে মিলেছে। বাংলাদেশ অংশে গোমতী নদীর মোট দৈর্ঘ্য ১৩৫ কিলোমিটার। বর্ষাকালে স্রোতঃস্বিনী এ নদীটি পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মকালে এর গতিধারা সরু হয়ে আসে। জানা যায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর গোমতী নদী দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত নৌপথে পণ্য পরিবহন উদ্বোধন করা হয়। এদিন প্রথমবারের মতো কুমিল্লা বিবির বাজার সীমান্ত দিয়ে কুমিল্লা-ভারতের সোনামুড়া নৌপথে ১০ টন সিমেন্ট নিয়ে একটি বার্জ ভারতের সোনামুড়া যায়। কুমিল্লা বিবির বাজার স্থলবন্দর এলাকায় এ পথের উদ্বোধন করার পর নৌযানটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় কর্মকর্তাদের নিকট বুঝিয়ে দেয় বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু এদিন সিমেন্টবোঝাই জাহাজটি পথিমধ্যে নদীর অন্তত ১৪টি পয়েন্টে নাব্য সংকটের কারণে ও কম উচ্চতার ব্রিজের নিচে আটকে যায়। ফলে নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার ঘণ্টা বিলম্বে বিকাল ৩টার দিকে সিমেন্টের প্রথম চালানটি সোনামুড়া পৌঁছায়। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে নৌ-বাণিজ্যের সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হলেও গোমতী নদীর ওপর কম উচ্চতার ২৩টি সেতু ও নদীর বিভিন্ন স্থানে নাব্য সংকটের কারণে বর্তমানে নৌরুটে বাণিজ্য থমকে আছে। কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাসুদ পারভেজ খান ইমরান বলেন, সরকার ভারতের সঙ্গে স্থল ও নৌ-পথে বাণিজ্য প্রসারে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। গোমতী নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা হলে আমদানি-রপ্তানিতে উভয় দেশই রাজস্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে লাভবান হবে। কাস্টমস এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেট কুমিল্লার সহকারী কমিশনার মো. সালাহ উদ্দিন রিপন জানান, বিবির বাজার স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের আমদানি-রপ্তানি পণ্যে রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে। নৌপথে বাণিজ্য পুরোদমে চালু করা গেলে রাজস্ব আয় আরো বৃদ্ধি পাবে। পাউবো-কুমিল্লার পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে নৌরুটে বাণিজ্যিকভাবে নৌযান চলাচলে গ্রীষ্মকালে যেমন নদীর নাব্য সংকট দেখা দেয়, তেমনি বর্ষায় পানি বৃদ্ধির কারণে নদীর ওপর ছোট-বড় ২৩টি কম উচ্চতার সেতু পণ্যবাহী বড় জাহাজ চলাচলে সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই নদী খননের মাধ্যমে নাব্য ফিরিয়ে আনার পর নৌরুটে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে হবে।’ তবে বাংলাদেশ-ভারত নৌ-বাণিজ্যের উদ্যোগ সফল হবে এমন আশা প্রকাশ করে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বসে নেই, আমাদের প্রকৌশলীরা এরই মধ্যে গোমতী নদী এলাকা পরিদর্শন করে এসেছেন। এ নদীর নাব্য ফিরিয়ে এনে পণ্যবাহী নৌযান চলাচলের উপযোগী করতে নদী খননের জন্য ৩১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে দাখিল করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে নদী খননে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ জন্য খনন কাজ শুরু করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।’
