ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৫৬

জানুয়ারি ১৬, ২০২০ তারিখে পুঁজিবাজারে যখন লেনদেন তলানিতে চলে যাচ্ছিল, বিনিয়োগকারী যখন হতাশায় ভুগছিল, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আইসিবি যখন  বিনিয়োগে সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছিল, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উচ্চ পর্যায়ের পলিসি মেকারদের সঙ্গে একটি সভা করেন। উক্ত সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছয়টি short-term ও long-term measures পুঁজিবাজারে প্রয়োগ করার নির্দেশ প্রদান করেন। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো :পুঁজিবাজারে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়িয়ে সক্ষমতা বাড়ানো; মার্চেন্ট ব্যাংক ও ইনস্টিটিউশনদের জন্য সহজ ক্রেডিট সুবিধা; রাষ্ট্র ও মালিকানাধীন আইসিবির বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানো; স্টক মার্কেটে কনফিডেন্স আনার পদক্ষেপ নেওয়া; ইনস্টিটিউশনাল ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং আইপিওর মাধ্যমে ভালো মৌলভিত্তিক কোম্পানি, বহুজাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তকরণ।

ইতিমধ্যেই প্রত্যেক ব্যাংককে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং যা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উত্সাহ প্রদান করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে ডিভিডেন্ড দেওয়ার ব্যাপারে যুগান্তকারী আইন পাশ করেছে, অর্থাত্ কোম্পানির Retained Earnings থেকে একটি অংশ ডিভিডেন্ড অবশ্যই দিতে হবে এবং ডিভিডেন্ড হিসেবে ক্যাশ যা দেবে, তার ৫০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দিতে পারবে। গত ১০ বছর যদি আমরা দেখি, প্রায় সব কোম্পানি শুধু বোনাস শেয়ার দিতে উত্সাহিত ছিল। এতে করে স্পনসর/ডিরেক্টর/প্রমোটররা লাভবান হতো আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতো সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

কোভিড-১৯-এর কারণে বাজার যখন তলানিতে চলে যাচ্ছিল তখন ১৯ মার্চ ২০২০ তারিখে প্রত্যেক শেয়ারে একটি যৌক্তিক ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দিয়েছিল, যা ছিল একবারে ঐতিহাসিক, অর্থাত্ বিনিয়োগকারীর শেয়ারে দাম একটি নির্দিষ্ট প্রাইজের নিচে ট্রেড হবে না। অনেকে আমরা ফ্লোর প্রাইস নিয়ে অনেক কথা বলেছি কিন্তু আজ প্রমাণিত হয় ওটা ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সর্বনিম্ন দামে শেয়ার বিক্রি থেকে রক্ষা করেছে। কোভিড-১৯-এর কারণে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে বর্তমান সরকার বাজেটে যে সুযোগ দিয়েছে তা আরো ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। সুদের হার ছয়/নয় নির্ধারণ করা, কালো টাকা সাদা করার সহজ সুবিধা, যা পুঁজিবাজারের তারল্যের জন্য অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছে। তাতে করে বাজারে টাকা ঢুকতে শুরু করেছে, যা পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট দূর করতে বড় ধরনের সহায়তা করছে।

বন্ড মার্কেটকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করার জন্য Up-Front-এ ট্যাক্স কর্তনের প্রভিশনটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। পুঁজিবাজারে লেনদেনের ওপর আরোপিত ট্যাক্স বিনিয়োগকারীর স্বার্থে বিলুপ্ত করা হয়েছে। জিরো কুপন বন্ডের আয়কে করমুক্ত করা হয়েছে। বন্ড মার্কেট নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু হয়েছে এবং খুব শিগিগরই এর সুফল দেশব্যাপী পেতে শুরু করবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃক প্রস্তাবিত টাকা ১ হাজার কোটি মিউনিসিপ্যাল বন্ড এর একটি বড় উদাহরণ। বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও সরকার পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা/জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার  লক্ষ্যে এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সব লিস্টেড কোম্পানি, ব্রোকার, স্টক এক্সচেঞ্জ ডিলার, ইস্যুয়ার, মার্চেন্ট ব্যাংকার, অডিটর, অ্যাসেট ম্যানেজার, এসেট ভ্যালুয়েশন কোম্পানিসহ সবাইকে সঠিক আইন মেনে ব্যবসা করার স্বার্থে নির্দেশ প্রদান করেছে। কোনো প্রকার অনিয়ম বা প্রতারণা  করা চলবে না। যেমন, স্পনসর/ডিরেক্টর/প্রমোটর সবাইকে (একক ও সম্মিলিতভাবে) ২ থেকে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। পুঁজিবাজারের জন্য এটা খুব ভালো দিক যে, ইতিমধ্যেই ভালো মৌলভিত্তিক অনেক কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে ২ থেকে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা পরিপালন করেছে। আমি মনে করি যেসব কোম্পানি ২-৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ প্রতিপালনের জন্য সময় চেয়েছে, তাদের তা প্রদান করা যেতে পারে। যারা এই বিষয়ে এখনো সম্পূর্ণ উদাসীন, তাদের পর্ষদ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা উচিত। কোম্পানিগুলোতে ইনডিপেন্ড ডাইরেক্টর অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। যোগ্য ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন  ইনডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নিয়োগ দিতে হবে, যারা নিজ স্বার্থের বাইরে শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষা করবে। তারা স্পনসর ডিরেক্টরদের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে।

সরকার পুঁজিবাজারে সুশাসনের প্রচণ্ড গুরুত্বারোপ করেছেন। এরই অংশ হিসাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার Z-Category কোম্পানির মানদণ্ড ঢেলে সাজানো হয়েছে। কোম্পানির যারা নিয়মিত এজিএম করে না, ডিভিডেন্ড দেয় না, পুঞ্জীভূত লোকসান পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে বেশি ইত্যাদি। Z-Category Settlement Period change করা হয়েছে। স্পনসর/ ডাইরেক্টর/ প্রোমোটরদের Block Module-এ রাখা হয়েছে। Dutch-Action Method চালু করা হয়েছে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রে। লক-ইন পিরিয়ড শুরু হয় প্রথম লেনদেনের তারিখের ওপর ভিত্তি করে।

সরকারের পলিসি হচ্ছে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ পার্টিসিপিশন বাড়ানো। সেজন্য ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডিপোজিটির সুদের হার কম হওয়ায়, বাজার যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে থাকে, তাহলে অবশ্যই পুঁজিবাজার হবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার টাকার প্রধান উত্স এবং ব্যাংক থেকে টাকা নেওয়ার চাপ ও কমে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিভিডেন্ড পলিসির কারণে সকলে এর সুফল পেতে শুরু করেছে। প্রতিটি ভালো লিস্টেড কোম্পানি ভালো ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়া শুরু করছে এবং এই বছরে কোভিড-১৯ সত্ত্বেও আমরা দেখতে পাচ্ছি বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ভালো মুনাফা করেছে। তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর ৯ মাসের মুনাফা এর ভালো উদাহরণ।

আমার বক্তব্য হলো, এখন আমরা যারা পুঁজিবাজারের সঙ্গে জড়িত, যেমন—বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, বাংলাদেশ ব্যাংক, মিনিস্ট্রি অব ফাইন্যান্স, লিস্টেড কোম্পানি, ট্রেক হোল্ডার, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ সবাই যার যে দায়িত্ব আছে তা যদি সঠিকভাবে পালন করি, তাহলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অনেক দূর যাবে এবং অর্থনীতিতে ভালো অবদান রাখবে। আমরা যেন ইমোশন দিয়ে না চলি, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে চলি, বাজারে যার যার অবস্থান থেকে সঠিক কাজগুলো করি। এখানে ব্যর্থতার সুযোগ নেই। যার যার দায়িত্বের জবাব তাকেই দিতে হবে, তিনি যদি নেতৃত্বে থাকেন তাহলে ইমোশন থেকে বের হয়ে কাজ করতে হবে।

বন্ড মার্কেট, মিউচ্যুয়াল ফান্ড, এসএমই মার্কেট, এটিবি বোর্ডকে effective করতে হবে। নতুন নতুন প্রোডাক্ট, যেমন Sukuk, ETF চালু করতে হবে। আমরা যেন একক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ না করি, যে যেখানে দায়িত্বে আছি নিয়ম মেনে কাজটা করি। কারো ব্যর্থতার দায় কেউ নেবে না। আমাদের সেটা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। দিনের শেষে সবাইকে তার কাজের জবাবদিহিতা করতে হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, সে যত প্রভাবশালীই হোক। আসুন, আমরা যার যার অবস্থান থেকে পুঁজিবাজারকে গতিশীল করি, সবাই মিলে বিনিয়োগকারীদের সঞ্চিত টাকার একটি অংশ পুঁজিবাজারে আনার পথ করে দিই, যাতে করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে; অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং সর্বোপরি দেশ অনেক এগিয়ে যায়। অন্তত আগামী ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ইনশাআল্লাহ বাজার মূলধন-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ১৪ শতাংশ থেকে অন্তত ৪০ শতাংশে যেন উন্নীত হয়।

n লেখক :সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড