২০১৭ সালের কথা। একটা খবরে হঠাত্ চোখ আটকে গেল। পদ্মা সেতুর পিলারের ওপর প্রথম স্প্যান বসতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ এই সেতুর ১৫০ মিটার অংশ দৃশ্যমান হবে। খবরটা শুনে যেন নড়েচড়ে বসলাম। যে পদ্মা সেতু ঘিরে এত আলোচনা, সমালোচনা, গুঞ্জন ছিল দেশ জুড়ে—সেই পদ্মা সেতু তাহলে বাস্তবে রূপ পেতে যাচ্ছে! বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মতো আমিও সেদিন আনন্দে আপ্লুত হয়েছিলাম। পদ্মা সেতু নিয়ে আরো বিস্তারিত খুঁজতে গিয়ে জানলাম, নদীর ওপর নির্মিত ৪২টি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। ১৫০ মিটার দীর্ঘ এই স্প্যানগুলো একটার পর একটা জোড়া দিয়েই তৈরি হবে পুরো পদ্মা সেতু। প্রথম স্প্যানটি বসানোর পর থেকেই তাই দেশবাসী অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে, কবে বসানো হবে সর্বশেষ স্প্যানটি; কবে দৃশ্যমান হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের পুরো পদ্মা সেতু! ১৬ কোটি জনগণের হাজারো দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে একের পর এক স্প্যান বসতে থাকে পদ্মা সেতুর পিলারের ওপর। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ,...—এভাবে ৪০তম স্প্যানটিও উঠে যায় পদ্মার ওপর। আর বাকি আছে একটি মাত্র স্প্যান। সর্বশেষ ৪১তম এই স্প্যানটিও বসতে যাচ্ছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে। ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু জোড়া দিতে এই একটি মাত্র স্প্যানই বাকি! ৪০তম স্প্যানটি বসানোর মাধ্যমে নদীর ওপর সেতুর ৬ কিলোমিটার অংশ দৃশ্যমান হয়েছে, এখন বাকি আছে মাত্র ১৫০ মিটার। এই ১৫০ মিটারের দূরত্বেরও সন্ধি ঘটবে মুজিববর্ষের বিজয়ের মাস ডিসেম্ব্বরে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে জাতি উপহার পাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘতম এই সেতু।
বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের কারণে পদ্মা সেতু পরিণত হয় মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। এই সেতুর বাস্তবায়ন হয়ে যায় বাংলাদেশের জয়গানের সমার্থক শব্দ। এখানেই আর ১০টি সেতুর সঙ্গে পদ্মা সেতুর পার্থক্য। এই সেতু কোটি কোটি বাঙালির সাহস আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। পদ্মার মতো খরসে াতা নদীর বুকে নিজস্ব অর্থায়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে সেতু নির্মাণ করার সাহস চাট্টিখানি কথা নয়। অনেকেই ভেবেছিলেন শেষতক পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন হবে না; কিন্তু বাংলাদেশ সেসব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে। এই সেতুর নির্মাণকাজের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের জনগণ তাদের সক্ষমতার জানান দেয়। পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর পরেও সংশয়বাদীদের বিরূপ মন্তব্যের কমতি ছিল না। থেমে ছিল না দেশি, বিদেশি কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র; কিন্তু তার জন্য সেতু তৈরির কাজ থেমে থাকেনি। প্রতিনিয়ত নানা বাধাবিপত্তি, চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে সেতুর কাজ চলতে থাকে। পৃথিবীতে যে কয়েকটি নদীর গতিপ্রকৃতি বোঝা অত্যন্ত দুরূহ, তার মধ্যে পদ্মা অন্যতম। এই নদীর ওপর সেতু নির্মাণে তাই বিভিন্ন ধরনের কারিগরি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অন্যদিকে এ বছরের শুরুতে পৃথিবীব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ফলে নির্ধারিত সময়ে সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হবে কি না—তা নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। তবে সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সেতুর কাজ নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে।
পদ্মা সেতু কেবল ইট, সিমেন্ট, কংক্রিটের তৈরি নিছক একটি সেতু নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৬ কোটি বাঙালির আবেগ। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের প্রতীক, দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন।
পদ্মা সেতু আর স্বপ্ন নয়, স্বপ্নপূরণ এখন আমাদের দোরগোড়ায়, অল্প কিছু সময়ের ব্যবধান মাত্র। পদ্মার বুক চিড়ে সেতু নির্মাণের কাজ যখন শুরু হয়েছে, তখন থেকেই অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করেছে দেশবাসী। প্রতিবার একটি করে স্প্যান বসানো হয়েছে, আর আমরা হিসাব রেখেছি আর কটি স্প্যান বাকি। এই হিসাব করতে করতেই অপেক্ষার সময় ফুরিয়ে এলো। সর্বশেষ স্প্যানটিও উঠতে যাচ্ছে প্রমত্তা পদ্মার বুকে। ধাতব এই স্প্যান দিয়েই আমরা ছুঁতে পারব স্বপ্নের পদ্মা সেতুকে। পদ্মা সেতুর এক একটি স্প্যান যেন সমালোচকদের মুখে চপেটাঘাতের ন্যায়। পদ্মার ওপর একটি করে স্প্যান বসেছে, আর বাঙালি জাতি বিশ্ববাসীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা কথা রাখতে জানি। পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্প্যানের সংবাদ পরিবেশন নিয়ে নানারকম ব্যঙ্গাত্মক কথা চালু আছে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়; কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, পদ্মা সেতুর স্প্যানগুলো আমাদের গৌরব, বাঙালির জাতীয় অহংকারের প্রতীক। একটি করে স্প্যান বসানো হলেই আমাদের সবাইকে জানান দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, দেখো আমরাও পারি। পদ্মা সেতুর স্প্যানগুলোর মধ্যে ১৬ কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা আর শ্রম লুকিয়ে আছে। এই স্প্যানগুলো যেন আমাদের স্বপ্নের কাছে পৌঁছানোর বিস্ময়কর এক সোপান!
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
