বিজয় দিবসের আগে প্রকাশিত হচ্ছে না রাজাকারের তালিকা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৪৮

এবারে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের আগে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামসের তালিকা প্রকাশ শুরুর কথা থাকলেও আইনি জটিলতার কারণে সেটি পিছিয়ে গেছে। বিদ্যমান জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইনে কেবলমাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির বিধান থাকলেও রাজাকারদের তালিকা তৈরি এবং তা প্রকাশের বিধান নেই। যে কারণে আইনটি সংশোধন ছাড়া রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করা হলে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে জামুকা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আইনটি সংশোধনের খসড়া প্রস্তাব আজ সোমবার অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওঠার কথা রয়েছে। খসড়া প্রস্তাবে রাজাকার ও আলবদরদের তালিকা তৈরি এবং সেটি প্রকাশের বিধান যুক্ত করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। জামুকা আইনের সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাসের পরেই রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, জানুয়ারিতে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে জামুকা আইনের সংশোধনী বিল পাস হতে পারে। সেক্ষেত্রে আগামী বছরের মার্চ থেকে রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ শুরু হতে পারে। গতকাল রবিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজাকারদের তালিকা প্রণয়ন ও প্রকাশ এবং জামুকা আইনের সংশোধনীর বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।

গতবছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের ‘বিতর্কিত’ তালিকা প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে তা বাতিল করে সরকার। গতবছর বিজয় দিবসের আগেরদিন সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক ১০ হাজার ৭৮৯ জন ‘স্বাধীনতাবিরোধীর’ তালিকা প্রকাশ করেন। ওই তালিকায় গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নাম আসায় ক্ষোভ আর সমালোচনার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ওই তালিকা বাতিল করা হয়।

এই প্রেক্ষিতে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামসের নতুন করে তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তালিকা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাজাহান খানকে আহ্বায়ক করে গত ৯ আগস্ট ছয় সদস্যের একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়। সাবকমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সংসদীয় কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, এবি তাজুল ইসলাম, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ও মোছলেম উদ্দিন আহম্মদ।

শাজাহান খান তখন জানিয়েছিলেন, এবার সংসদীয় কমিটি রাজাকারদের তালিকা তৈরি করবে। একাজে সাবকমিটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে যারা মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আছেন, তাদেরকে কাজে লাগাবে। আর তথ্য নেওয়া হবে যুদ্ধকালীন কমান্ডার এবং উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড থেকে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমান্ডারদের আমরা ব্রিফ করে দেব। তারা তালিকা তৈরি করবেন। কোনো একক কর্তৃপক্ষ তালিকা করবে না। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এমপিদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তারা সমন্বয় করবেন। শাজাহান খান তখন ইত্তেফাককে জানিয়েছিলেন, এ বছর বিজয় দিবসের আগেই রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ শুরু করা হবে।

তবে গতকাল অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে শাজাহান খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘জামুকা আইনের সংশোধনী সংসদে পাশের পর রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ শুরু করা হবে। এর আগে করলে তালিকা নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।’ তিনি বলেন, তার নেতৃত্বে গঠিত সাবকমিটি রাজাকারদের তালিকা প্রণয়নে ইতিমধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে। রাজাকারদের তালিকা সংবলিত যেসব বই ও দলিলপত্র রয়েছে সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে রাজাকারদের যে তালিকা রয়েছে সেটা মোটামুটি নির্ভরযোগ্য।

জামুকা আইনের সংশোধনী আজ মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে বলে গতকাল সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অংশ নিয়ে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, জামুকা আইনের সংশোধনী খসড়ায় অনেকগুলো সংশোধনীর প্রস্তাব রয়েছে। এরমধ্যে রাজাকার-আলবদরদের তালিকার বিধানটিও রয়েছে। প্রসঙ্গত, জামুকা আইনের ৭ এর (ঝ) ধারায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের কথা বলা আছে।

রাজাকারদের তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে মন্ত্রী মোজাম্মেল হক ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘এবার তো তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব নিয়েছে সংসদীয় কমিটি। কমিটি তালিকা করুক। মন্ত্রণালয়ে তালিকা আসার পর যাচাই-বাছাই করে আমরা সেটি প্রকাশের উদ্যোগ নেব।’                                                     

সংসদীয় কমিটির সভাপতি শাজাহান খানের সভাপতিত্বে গতকাল অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বাধ্যতামূলক ছুটি প্রদানের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ কার্যক্রম হিসেবে দেশের ৬৪টি জেলার ২৯৩টি উপজেলার ৩৬০টি স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ/জাদুঘর নির্মাণের সংস্থান রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ১০৪টি স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ১২৪টি স্থানে নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে বলে বৈঠকে জানায় মন্ত্রণালয়।