তখনো ভোর হয়নি। মহিষলুটির শুঁটকি চাতালের দিকে টানা পায়ে হাঁটছেন রাহেলা। হয়তো মাছ নামানো শুরু হয়ে গেছে। আজ একটু দেরি হয়ে গেছে তার। নলুয়াকান্দি গ্রাম থেকে প্রায় দুই মাইল পথ মহিষলুটির শুঁটকির চাতাল। তাই এক রকম দৌঁড়ের মতো করে হাঁটতে থাকেন তিনি। তারা সাত নারী শ্রমিক কাজ করেন ঐ চাতালে।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটি বৃহত্ মাছের আড়তের কাছে নান্নু মিয়ার শুঁটকির চাতাল। তিনি দলনেত্রী, অপর ছয় জনের কাজের তদারকি করতে হয় তাকে। তাড়াশ উপজেলার নলুয়াকান্দি ও পংরৌহালী গ্রামের মোট সাত নারী—রাহেলা, ফিরোজা, জমিরণ, মইফুল, অজেদা, পারভীন ও নাজমা কাজ করেন ঐ শুঁটকির চাতালে। চাতালে পৌঁছে দেখেন মাছ নেমে গেছে। সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নিত্যদিনের মতোই চাতালের মাচায় মাছ ছড়িয়ে দিতে থাকেন রাহেলা। পুঁটি, খলিশা, টেংরা, চেলা, ঢেলা, কাকিলা, চাপিলা ও মোয়া মাছ।
কাজের ফাঁকে কথায় কথায় রাহেলা জানান—এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে তার স্বামী মারা গেছেন ৯ বছর আগে। অর্থাভাবে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারেননি। তারা পরের বাড়ি পেটেভাতে কাজ করে। এখান থেকে যা পান তাতে তাদের তিন জনের খাওয়াপড়া হয় না। এক প্রশ্নের জবাবে রাহেলা বলেন, ‘মজুরি কম হলিও এ কাম না কোর্যা কী হরবো। খাবো কী?’ একই চাতালের শ্রমিক রাহেলার প্রতিবেশী নাজমা জানান, চার মেয়ে রেখে তার স্বামী মারা গেছেন ছয় বছর আগে। এখানে কাজ করে যা পান তা দিয়ে দুই বেলা পেটপুরে ভাত জোটে না তাদের। কথা হয় অন্য শুঁটকি চাতালকন্যা মহিষলুটির আমেনা, নলুয়াকান্দির জোসনা, চম্পা, কমেলা ও সাজেদার সঙ্গে। সবাই জানালেন তাদের দুর্বিষহ অভাব-অনটনের কথা।
চলনবিলের পাইকারি মাছের বাজার মহিষলুটির আশপাশে ছয়টি শুঁটকির চাতালে কাজ করেন অর্ধশত পুরুষ ও দেড় শতাধিক নারী শ্রমিক (চাতালকন্যা)। উল্লাপাড়া উপজেলার লাহীড়ি মোহনপুর এলাকায় নান্নু মিয়া, হবি শেখ, সাচ্চু মিয়া ও বরাত আলীর শুঁটকির চাতালসহ মোট পাঁচটি চাতালে কাজ করছেন শতাধিক শ্রমিক। এসব চাতালে কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরামহীন কাজ করেন নারী শ্রমিকেরা। মজুরি পান মাত্র ১৫০ টাকা। আর পুরুষ শ্রমিকেরা পান ‘তবাক খরচসহ’ (তামাক-বিড়ি) ৩৫০ টাকা।
শুঁটকি শ্রমিকরা জানান, তিন কেজি টাটকা মাছে এক কেজি শুঁটকি হয়। মাছ মাপজোখের পর মাখানো হয় লবণ। লবণ মাখানো হলেই কাঁখে করে নারী শ্রমিকরা নিয়ে যান মাচায়। সেখানে মাছ সুন্দর করে বিছিয়ে রোদমুখী করা হয়। তারপর সারা দিন কয়েক বার উলটে-পালটে দেওয়া হয়। আর এসব কাজই হয় নারী শ্রমিকের হাতে। রোদ মৃদু থাকলে শুকাতে লাগে তিন-চার দিন। আর রোদ চড়া থাকলে এক দিনেই শুঁটকি হয়ে যায়। বড় কিছু মাছে একটু বেশি সময় লাগে।
মহাজনরা জানান, মাছ শুঁটকি শেষে এ, বি ও সি গ্রেডে বাছাই করা হয়। ‘এ’ ও ‘বি’ গ্রেডের শুঁটকি মাছ ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের ২৫টি দেশে রপ্তানি করা হয়। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে চলনবিলের সুস্বাদু শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া ‘সি’ গ্রেডের শুঁটকি মাছ দিনাজপুর, সৈয়দপুর, নীলফামারী, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়।
চলনবিলে রয়েছে ১ হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৯৩টি বিল, ৪ হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ৩২টি নদী ও ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খাল এবং অসংখ্য বড় বড় পুকুর জলাশয়। এই বিল এলাকায় তিন জেলা সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরের ১০ উপজেলার কয়েক হাজার নারী শ্রমিকের হাতে তৈরি চলনবিলের শুঁটকি যাচ্ছে দেশ-বিদেশে। যাদের হাতের জাদুর পরশে চলনবিলের শুঁটকি মাছের এত কদর তাদেরই কোনো কদর নেই। তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত, উপরন্তু নানা প্রকার কটু কথা দুর্ব্যবহার সহ্য করেই কাজ করতে হয় মহাজনের চাতালে। এদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। নারী শ্রমিকের মজুরির বিষয়ে কথা বলতে গেলে চাতাল মালিকরা নানাভাবে দায়সারা জবাবে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।
এ ব্যাপারে নাটোরের এনজিও সংস্থা পল্লী কল্যাণ শিক্ষা সোসাইটির (পিকেএসএস) নির্বাহী পরিচালক ও চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের স্থানীয় নেত্রী ডেইজি আহমেদ বলেন, তিনি চাতাল মালিকদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং মজুরি বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকদের সঠিক মজুরি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদের সমবেত করে প্রয়োজনে স্থানীয় এমপিদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরবেন।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
