১৯৪৭ সালের দেশভাগের পূর্বেই ভবিষ্যত্ ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি পাকিস্তানবাদী লেখক বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার খোরাক জুগিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের পরেই নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভাষার প্রশ্নটি সামনে আসে এবং কয়েকটি পত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। কলিকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘আজাদ’, দৈনিক ‘ইত্তেহাদ’, ‘মর্নিং নিউজ’, সাপ্তাহিক ‘মিল্লাত’, ‘কমরেড’ ও ‘স্বাধীনতা’ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রস্তাবিত ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা-সম্পর্কিত অনেকগুলো লেখা প্রকাশিত হয় এবং প্রাথমিক পর্বের রাষ্ট্রভাষা বিতর্কের সূচনা ঘটে।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, এ পর্বে লেখক-সাহিত্যিকরা এ বিতর্কের সূচনা করলেও যেসব পত্রিকায় এ বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল, সে পত্রিকাগুলোর কম-বেশি রাজনৈতিক সংশ্রব ছিল এবং কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনীতিবিদ সমর্থন জোগাতেন। এ কথা সত্য যে, এসব পত্রিকায় প্রকাশিত রাষ্ট্রভাষা-সম্পর্কিত লেখালেখিকে সাধারণভাবে পত্রিকার রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা সংশ্লিষ্ট লেখকদের ‘রাজনৈতিক আনুগত্য হিসেবে গ্রহণ করা চলে না। কারণ, উপরোক্ত কোনো কোনো পত্রিকায় সে সময়ে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে দুই পক্ষের মতামতই গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছিল।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি প্রথমদিকে রাজনীতিকদের তেমন সম্পৃক্ত না করলেও কোনো কোনো অবাঙালি বুদ্ধিজীবী বিষয়টি রাজনীতিকদের নজরে আনেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালান। স্বাধীন ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দিলে পাকিস্তানে অবাঙালি মুসলিম রাজনৈতিক মানস উর্দুর পক্ষে সংগঠিত হতে থাকে। তরক্কি-ই উর্দু নেতা বদরুদ্দিন আহমদের এক চিঠির জবাবে খাজা নাজিমউদ্দিন, মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী তমিজউদ্দিন খান ১৯৪৩ সালেই ভবিষ্যত্ পাকিস্তানের ‘লাংগুয়া ফ্রাঙ্কা’ হিসাবে ‘উর্দু’ ভাষার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। চৌধুরী খালেকুজ্জামান হায়দরাবাদের উর্দু সম্মেলনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে অভিমত পোষণ করেন। ঢাকার নবাবদের মাতৃভাষাকে আমলে এনে পরবর্তী রাষ্ট্রভাষার ক্ষেত্রে উর্দুর পক্ষে ঝুঁকে পড়ার যে অভিসন্ধি লক্ষ করা যায়, তার পটভূমি নির্মাণে এর গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না।
পাকিস্তান রাষ্ট্রে ভাষাভাষী সংখ্যানুপাত, ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক-নৃতত্ত্বের বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারটি ছিল মূলত রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিতাড়িত, যার পেছনে ছিল অবাঙালি রাজনীতিবিদদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।
দেশ বিভাগকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অভিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেই দৈনিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। সাহিত্যিক সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন এ পত্রিকার সম্পাদক এবং সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য বলে পরিচিত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত এ পত্রিকার পরিচালনা বোর্ডের সচিব হিসবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে একটি উদার ও প্রগতিশীল আবহ ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় বিরাজমান ছিল।
সোহরাওয়ার্দীর জন্ম একটি অভিজাত উর্দুভাষী পরিবারে। সোহরাওয়ার্দী পরিবার দুই শতাব্দীকাল ধরে মেদিনীপুর বসবাস করলেও তার পরিবারের কেহই বাংলা লিখতে কিংবা বলতে পারতেন না। তবে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের সময় থেকেই তিনি গ্রামেগঞ্জে ভাঙা বাংলায় কথা বলতে শুরু করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন মনেপ্রাণে গণতন্ত্রী। অধিকাংশ মুসলিম লীগ নেতারা যেখানে অভিজাত্য অতিক্রম করে তথাকথিত ‘শ্রেণি’ ভাঙতে পারেননি সোহরাওয়ার্দী সে ক্ষেত্রটি কেবল অতিক্রম করেই ক্ষ্যান্ত হননি, তিনি মিশে গিয়েছিলেন সাধারণ শ্রমজীবী ও গণমানুষের কাতারে।
‘পাকিস্তান’ সৃষ্টির প্রাক্কালে সোহরাওয়ার্দীর ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকাতেই প্রথম ভাষা বিতর্ক শুরু হয়েছিল। এ পত্রিকায় ১৯৪৭ সালের মধ্যভাগে প্রবন্ধকার আবদুল হক ‘বাংলাভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। আবদুল হকের ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে’ শীর্ষক আরো একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকার ২৭ জুলাই ১৯৪৭ সংখ্যায়। এছাড়া মাহবুব জামাল জাহেদীর ‘রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ নামক আরেকটি মূল্যবান প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায়। তাছাড়া পূর্ববাংলার প্রথম পর্বের ভাষা আন্দোলনের অনেক খবরই সোহরাওয়ার্দীর ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা গুরুত্বসহকারে নিয়মিত প্রকাশ করত। এক্ষেত্রে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সোহরাওয়ার্দী, সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ এবং পরিচালক বিভাগের সচিব তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার উদার দৃষ্টিভঙ্গিকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ কথা সকলেরই জানা যে, ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বারবার সোহরাওয়ার্দীর ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকার পূর্ববাংলায় প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ১৯৫০ সালে তা পূর্ব বাংলায় প্রবেশে পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়। এরপর কলিকাতায় ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ হয়ে যায়।
এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই যে, সোহরাওয়ার্দীর ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা ’৪৮ পর্বের ভাষা আন্দোলনকালে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পূর্বেই ১৯৫১ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের আরমানিটোলার এক সভায় সোহরাওয়ার্দী বক্তৃতা দেন। এ জনসভায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, এ ব্যাপারে সভার মধ্য থেকে একজন প্রশ্ন করলে জবাবে সোহরাওয়ার্দী বাংলা ভাষার কথাই বলেছিলেন। তার এ ঘোষণায় আরমানিটোলা ময়দানে সেদিন জনতা উল্লাস প্রকাশ এবং ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘সোহরাওয়ার্দী জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিতে থাকে।
তবুও ভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানের মোহাজের রাষ্ট্র নেতা অবাঙালি আমলা এবং বুদ্ধিজীবীরা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। অবাঙালি রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিক মওলানা রাগিব আহসান গোড়া থেকেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে তিনি ১৯৫২ সালের মার্চ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অনেকগুলো চিঠি লেখেন। এসব চিঠিতে তিনি সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষা, উর্দুকে কেন্দ্র এবং পাক-বাংলাকে প্রদেশে চালু করার তাগিদ, উর্দুবিরোধী তত্পরতা বন্ধ করার আহ্বান এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব গ্রহণ না করার পরামর্শ দেন। তা সত্ত্বেও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোনোভাবেই প্রভাবিত হন নাই। তিনি ছিলেন প্রকৃত জননেতা এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। ফলে নিজে উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও ভাষার প্রশ্নে সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলার দাবিকে কখনো খাটো করে দেখেননি। কিংবা এক্ষেত্রে কখনো দ্বিধান্বিতও ছিলেন না। সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার কথাই ভেবেছিলেন। ভাষা আন্দোলনকালে সোহরাওয়ার্দী রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন না। তবে একজন বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনি বরাবরই পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের জন্য দুটি রাষ্ট্রভাষার পক্ষে ছিলেন।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুলভাবে জয়লাভ করে। যুক্তফ্রন্টের ২৩ দফার মধ্যে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনাকালে সোহরাওয়ার্দী রাষ্ট্রভাষার ব্যাপারটির প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখেন। দ্বিতীয় গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রাক্কালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালের ৩১শে জানুয়ারি করাচিতে তদানীন্তন গণপরিষদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে শাসনতন্ত্র বিলের ওপরে যে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দেন সেখানে অন্যন্য বিষয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটিও উত্থাপন করেন। তিনি বিষয়টি পূর্ব বাংলার প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষাবৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। ঐ সময়ে পাকিস্তানের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রে পাকিস্তানের দুটি রাষ্ট্রভাষা থাকবে বলে উল্লেখ ছিল। আর এই ভাষা বাংলা ও উর্দু। তারপর কিছুকাল পরে একটি ‘জাতীয় ভাষার’ উন্মেষ সাধন করা হবে। এই ‘জাতীয় ভাষা’ তৈরির লক্ষ্যটি ছিল বিভ্রান্তিকর ও ষড়যন্ত্রমূলক। সোহরাওয়ার্দী তা বুঝতে পেরেছিলেন এবং শাসনতন্ত্রে দুটি রাষ্ট্রভাষা উল্লেখ করে পরে একটি জাতীয় ভাষায় উত্তরণের উদ্দেশ্যটি তার কাছে মোটেই স্পষ্ট ছিল না। তাই তিনি সেদিন বলেছিলেন ‘আপনারা যদি সত্যি একে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে সাহসের সঙ্গে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সে কথা ঘোষণা করুন। তিনি ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাই দেশের রাষ্ট্রভাষা হবে, তা সুস্পষ্ট করে ঘোষণা করার সত্সাহস কেন আপনাদের নেই।’ সোহরাওয়ার্দী আরো মন্তব্য করেন, ‘ভাষা নিয়ে সম্প্রতি এই নতুন প্রশ্নের অবতারণা করে তারা বিরোধের আর একটি বিষবৃক্ষ বপন করছেন। কারণ এতে ব্যাপারটা আগাগোড়া আবার ঘোলাটে হয়ে গেল। আপনারা এই শাসনতন্ত্রে রচয়িতা এবং প্রবক্তা। কাজেই যেভাবে পারেন, এই বিরোধ আপনারা মিটিয়ে ফেলুন। এই পরিষদে আপনারা হচ্ছেন সংখ্যাগুরু। সংখ্যাধিক্যের এই শক্তি দিয়ে আপনারা বলে দিন, আপনারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু দয়া করে ব্যাপারটিকে ঘোলাটে করে রাখবেন না।’
লেখক: ইতিহাস গবেষক
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
