১৯৭২ সালের ১১ আগস্ট মুক্তি পায় ‘ওরা ১১ জন’। স্বাধীন বাংলাদেশে শ্যুটিং করা প্রথম চলচ্চিত্র। পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামেরও প্রথম। দর্শকরা ছবিটি দারুণভাবে গ্রহণ করে। আর সে সাফল্যে উত্সাহিত হয়ে পরের ছবির জন্য প্রস্তুতি নেন।
প্রথম ছবিতে তিনি দেখিয়েছিলেন সাধারণ জনযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধ। এবার চিন্তা করলেন মুক্তিযুদ্ধে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী মানে আনসার, বিডিআর (পাকিস্তান আমলের ইপিআর, বর্তমানে বিজিবি), পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণ নিয়ে ছবি বানাবেন। ছবির নামও ঠিক করে ফেললেন—‘সংগ্রাম’।
কিন্তু কাহিনি তখনো ঠিক করেননি। ভেবেছিলেন জিয়াউর রহমানের ওপর কাহিনি সাজাবেন। তাঁকে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ঘটনা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি সেনারা গ্রেপ্তার করার আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাটের ‘বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে সেই ঘোষণা প্রচার করেন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। পরদিন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবারও তা প্রচার করেন জিয়াউর রহমান।
চাষী নজরুলের মনে হয়েছিল ঐ ঘটনাটাকে বেশ একটা সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট দেওয়া যাবে। তাই দেখা করেন জিয়ার সঙ্গে। সব শুনে জিয়া অবশ্য অন্য টোটকা বাতলান। অকপটে স্বীকার করে নেন মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফের শ্রেষ্ঠত্ব। বলেন, ‘আমার ওপর না, তুমি বরং খালেদের ওপর ছবি বানাও। ওদের মুক্তিযুদ্ধের গল্পে তুমি অনেক বেশি নাটকীয়তা পাবে। সিনেমাটিক ব্যাপার-স্যাপার অনেক বেশি পাবে।’
বীর উত্তম খালেদ মোশাররফকে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সবচেয়ে সাহসী ও কুশলী সেনাকর্মকর্তা। মুক্তিবাহিনী গঠন থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা, পাকিস্তানি সেনাদের যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, সম্মুখ সমর—প্রতিটা ক্ষেত্রে তাঁর ছিল গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন তিনি। ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর ও নোয়াখালীর খানিকটা অংশ নিয়ে ছিল এই সেক্টর। তার হেডকোয়ার্টার মেলাঘর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। আর কিংবদন্তি গেরিলা বাহিনী ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এরও নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। শেষ দিকে মুক্তিবাহিনীর তিনটি নিয়মিত ব্রিগ্রেড গঠন করা হয়। তার একটি—কে ফোর্স ছিল তাঁর নেতৃত্বে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশন তাঁর ওপর ‘মেজর খালেদ’স ওয়ার’ নামে প্রামাণ্যচিত্র বানায়। মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ গ্রহণের যে ভিডিওটি সচরাচর দেখা যায়, সেটার শপথবাক্য পাঠ করানো মানুষটিই খালেদ মোশাররফ।
এককথায় মুক্তিযুদ্ধে খালেদ মোশাররফের বীরত্বগাথা বা তাঁর কাহিনিতে সিনেমাটিক ব্যাপার-স্যাপারের কমতি নেই কোনো। সঙ্গে ছিল আরেকটি বিশেষ সুবিধা। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় খালেদ মোশাররফ নিয়মিত ডায়েরি লিখেছেন। তাতে সবকিছু সবিস্তারে লেখা—কোথায়, কখন, কীভাবে যুদ্ধ করেছেন—একেবারে তারিখ-সময়-স্থান সমেত লিপিবদ্ধ করা। সেই ডায়েরি থেকেই ছবির কাহিনি রচনা করেন চাষী নজরুল। ছবিতে যুদ্ধের যত ঘটনা দেখানো হয়েছে প্রায় প্রতিটিই সেখান থেকে নেওয়া। সঙ্গে কেবল কিছু আখ্যান জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন ছবির শেষে নায়ক ফিরে এসে দেখে তার স্ত্রী মারা গেছে। এটা পরিচালকের কল্পিত।
একদম শেষ দৃশ্যের শ্যুটিংয়ের গল্পটা চমকপ্রদ। চাষী নজরুলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাতে স্বাধীন দেশের সামরিকবাহিনী কুচকাওয়াজ করে সশস্ত্র সালাম জানাবে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেটা দিয়ে শেষ হবে ছবি। মিনিটখানেকের ব্যাপার। কিন্তু সেজন্য বঙ্গবন্ধুকে রাজি করাবে কে! সে দায়িত্ব নিলেন ছবির নায়ক স্বয়ং। খসরু আগে ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা। ১৯৬৯-এ ছাত্রলীগ ঢাকা থেকে মুসলিম লীগের এনএসএফ গুন্ডাবাহিনীকে উত্খাত করেছিল। তার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বীর বিক্রমে। বঙ্গবন্ধু তাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। সেই সুযোগই নেন খসরু। একরকম জোর করেই রাজি করান নেতাকে।
সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পিলখানায় শ্যুটিংয়ের বন্দোবস্ত করা হয়। সেদিন বাংলাদেশ রাইফেলসের একটা অনুষ্ঠান ছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ঠিক হয়, তার আগেই করা হবে শ্যুটিং। সে অনুযায়ী নেওয়া হয় সব প্রস্তুতি।
মাঠে প্রস্তুত সুসজ্জিত সেনাদল। একদম সামনের সারিতে খসরু। আর মঞ্চে সবার সামনে বঙ্গবন্ধু। পেছনে সারি বেঁধে সেনাবাহিনীর সব শীর্ষ কর্মকর্তা—কে এম সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, জিয়াউর রহমান প্রমুখ। মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে কয়েক দফা কুচকাওয়াজ চলে। সুসজ্জিত সেনাদলের সঙ্গে পা মেলান খসরুও। পরিচালকের কথামতো স্যালুট নেওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়ান বঙ্গবন্ধু। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে নেওয়া হচ্ছে শট। একসময় অধৈর্য হয়ে পরিচালককে স্নেহের ধমক দেন বঙ্গবন্ধু, ‘এই, কতক্ষণ হাত তুইলা রাখব রে।’ চাষী নজরুল কাচুমাচু মুখে বললেন, ‘আর অল্প কিছুক্ষণ।’
বঙ্গবন্ধু মুখে বললেন, ‘আরে কী করস না করস তোরা!’ কিন্তু ঠিকই শ্যুটিং শেষ করেন। প্রায় মিনিট দশেক স্যালুট নেওয়ার ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থেকে!
‘সংগ্রাম’ মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি। ব্যবসায়িকভাবে খুব একটা সুবিধা অবশ্য করতে পারেনি। তবে সমালোচকদের বেশ প্রশংসা কুড়ায়। বিশেষ করে যুদ্ধ-দৃশ্যগুলো। আর কাহিনিচিত্রের জন্য বঙ্গবন্ধুর অভিনয়ের ঘটনাও সম্ভবত এই একটিই।
