পথশিশুর আর্তনাদ শুনতে পাই

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:২০

প্রত্যেক মানুষের জন্মগতভাবে একটা নাম থাকে। আর থাকে ব্যক্তিগত একটা পরিচয়। কিন্তু সবকিছুর বাইরে গিয়ে কিছু শিশু পরিচিত হয় কেবল পথশিশু নামে।  কখনো তাদের টোকাই বলে ডাকে, কেউ আবার পথশিশু বলেই চেনে।

সারা দিন শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরেফিরে কাটে এলোপাতাড়ি সময়। কখনো বস্তা কাঁধে ময়লা পোশাকে দেখা যায় আবর্জনার স্তূপে। চোখের মাঝে ভেসে ওঠে তাদের গোটা জীবনের রুক্ষতা। চেহারা দেখে মনে হয় এরা বুঝি হাসতে জানে না কখনো। চেহারার ওপর  জিবনদশার গোটা চাপ ভেসে ওঠে।   এদের স্কুলের বেতনের চিন্তা নেই। আর না ভোগ-বিলাসের চিন্তা আছে। কেবল দুমুঠো খাবারের তাড়নায় এদিক-ওদিক তাকিয়ে থাকে। কখনো ডাস্টবিন হাতড়ে বেড়ায় ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে। গরমের সময় জরাজীর্ণ পোশাকের দিকে খেয়ালও রাখে না এরা। কখনো পার্কে ‘ফুল নিবে গো’ বলে চিল্লাতে থাকা নিষ্পাপ ফুলের মতো শিশুটি। সে জানতেও পারে না তার এই জীবনদশার কারণ।

তাদের আর পাঁচটা শিশুর মতোই শিক্ষা অর্জনের অধিকার ছিল। তীব্র অসুখে যখন শরীরে কাঁপুনি ওঠে, তখন তাদেরও ভালো চিকিত্সা পাওয়ার অধিকার ছিল। দুমুঠো খাবার আর পরিধানের পোশাকের অধিকার কেবল পাঁচতলার ঐ সাহেবের বাবুদের জন্য নয়। এই অধিকার তাদের জন্যও ছিল। কবে থামবে এই পথশিশুদের আর্তনাদ? শীতকাল এলে আমাদের সবার মাথায় আসে পিঠাপুলির আয়োজন।  কারো মাথায় আসে স্টাইলিশ পোশাকের কালেকশন। আমরা ভুলেই যাই পথের পাশে শায়িত থাকা সেই শিশুগুলোর কথা? এই তীব্র শীতে যখন দাঁতে দাঁত চেপে সারা শরীর কাঁপে, তখনো সেই রাস্তা আঁকড়ে শুয়ে থাকা ফুলের কলিকে আমরা দেখতে পাই না। বরং পাশ ঘেঁষে দাঁড়াতেই আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য বেড়ে যায়। আমরা ভুলেই যাই তারাও মানুষ। বাড়িতে পোষা বেড়াল বা কুকুরটার জন্য যতটুকু আদর-মহব্বত দেখাই, ঠিক ততটুকুও যদি আমরা এই পথশিশুদের ওপর দেখাই, তাহলে হয়তো গোটা সমাজের রূপ বদলে যাবে।

আমরা চাইলে এই শীতে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। নিজেদের পুরোনো পোশাকগুলো তাদের জন্য উত্সর্গ করতে পারি।  নতুন পাঁচটা পোশাক কেবল নিজের জন্য না নিয়ে, ঐ পথশিশুদের জন্য দিতে পারি সেরা উপহার। বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি যদি মডেলদের জন্য স্পনসর না করে এই পথশিশুদের জন্য কিছু করতে পারে, তাতে বরং তাদের মার্কেটিং  কমে যাবে না, আরো বাড়বে। আমরা পারি, আমরা চাইলেই পারি মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে, পথশিশুদের ভালোবেসে নিজেদের সমাজকে পথশিশুর আর্তনাদমুক্ত করতে, নিজেদের অতিরিক্ত খাবার ডাস্টবিনে না ফেলে পরিমিত পরিমাণ গ্রহণ করতে এবং বেঁচে যাওয়া খাবারটা দিয়ে অন্যের পেটের ক্ষুদা মেটাতে।

আমরা চাইলেই সরকার থেকে বিতরণ করা কম্বলগুলো ক্ষমতার দাপটে নিজের ঘরভর্তি না করে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে পারি? প্রতিটি শিশুর অধিকার বুঝে দিতে হবে। এদেশের ভবিষ্যত্ রাস্তায় থাকবে যত দিন, তত দিন দেশ উন্নয়নের মুখ দেখা থেকে বঞ্চিত হবে।

সরকারি ও বেসরকারিভাবে একজোট হয়ে সঠিক মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য হলেও এই পথশিশুদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা এমনকি বিনোদনের ব্যাবস্থা তৈরি করতে হবে। মূল্যবোধের শিক্ষা একটি শিশু তখনই পাবে, যখন তার সঠিক মূল্যায়ন হবে। দেশের সন্ত্রাস, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতিসহ এসব অন্যায় অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব হবে; যখন শতভাগ মানুষ শিক্ষার আলো দেখবে, পথশিশু পাবে মূল্যবোধের শিক্ষা, যখন তারা পাবে আদর্শ মানুষ হওয়ার গাইডলাইন।  ধারণা করা হচ্ছে, দেশে প্রায় ৬ লাখ পথশিশু রয়েছে, যার ৭৫ শতাংশ ঢাকায় বসবাস করছে। রাজধানীর মতো একটা জায়গায় চাইলেই সম্ভব এই শীতে পথশিশুদের জন্য শীতবস্ত্র দানসহ বিভিন্নভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানো। এদের প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু হতাশায় ভুগে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাদের ধারণা, নেশার সময় তাদের নিজেদের কষ্ট ভুলে থাকা যায়, নিজের অবস্থান কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ভুলে থাকা যায়। এদের না আছে বিছানা, না আছে গোসল করার সুযোগ।  পোশাকের অভাব তো আছেই। পথশিশুদের মধ্যে অধিকাংশ হলো ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তান, যাদের বাবা-মা বহুবিবাহে লিপ্ত। আবার কেউ নদীভাঙন, পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাসহ বিভিন্ন কারণেই হয়েছে পথশিশু। এখন প্রয়েজন পথশিশুদের মধ্যে যাদের পরিবার আছে, তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। যাদের কেউ নেই, তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কারিগরি শিক্ষা প্রদানের সুযোগ দিয়ে মানবসম্পদে পরিণত করা।

এক কথায়, কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে।  গড়ে তুলতে হবে পথশিশুদের জন্য বসবাসের স্থান আর পথশিশু নাম বদলে তৈরি করতে হবে তাদের ব্যক্তিগত পরিচয়? সমাজের সবাই মিলে এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে, তবেই দেশ এগিয়ে যাবে নতুন পরিচয় নিয়ে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ