দেশের আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকাগুলোর কথা বলতে গেলে প্রথমেই রাঙ্গামাটির কথা চলে আসে। রাঙ্গামাটির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষেরা বারবার সেখানে ছুটে যায়। পুরো রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য তাদেরকে মোহিত করলেও বিশেষ কিছু স্থান তাদের কাছে অন্যরকম আবেদন নিয়ে হাজির হয়। ‘লাভ পয়েন্ট’ হচ্ছে এমনই একটি স্থান। এই লাভ পয়েন্ট নামকরণের পেছনে রয়েছে হূদয়স্পর্শী এক ঘটনা।
ঘটনাটি ঘটে ২০১৪ সালের মার্চ মাসের ১৯ তারিখ। ভাড়া করা নৌকায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী পর্যটক আলাউদ্দিন পাটোয়ারী তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী আইরিন সুলতানা লিমাকে নিয়ে কাপ্তাই হূদে ঘুরতে বের হন। হঠাত্ ঝড়ের কবলে পড়েন তারা। ঝড়ে নৌকা দুলে উঠলে লিমা ভয়ে পানিতে ঝাঁপ দেন। স্ত্রীকে বাঁচাতে আলাউদ্দিনও হূদের জলে লাফিয়ে পড়েন। কাপ্তাই হূদে নিখোঁজ হন তারা। এ ঘটনার পর দুই দিন ধরে ঐ দম্পতির খোঁজে পুরো কাপ্তাই হূদ চষে ফেলেন ডুবুরি আর উদ্ধারকারী দল। তৃতীয় দিন সকালে রাঙ্গামাটির অন্যতম পর্যটন স্পট ঝুলন্ত ব্রিজের অদূরে হূদে ভেসে ওঠে দুজনের মৃতদেহ। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় ছিলেন তারা। মরণও যেন পারেনি দুজনকে আলাদা করতে। ভালোবাসার এমন বিরল দৃশ্য পার্বত্য শহর রাঙ্গামাটির মানুষকে আপ্লুত করে। আলাউদ্দিন-লিমার ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যে স্থানে তাদের মরদেহ ভেসে উঠেছিল তার পাশেই পলওয়েল ন্যাচার পার্কে নির্মিত হয়েছে দেশের প্রথম লাভ পয়েন্ট। শুধু এ দম্পতিই নয়, সারা পৃথিবীর সব প্রেমিক-প্রেমিকার চিরন্তন ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানিয়ে রাঙ্গামাটির এসপি আলমগীর কবিরের উদ্যোগে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনায় এটি নির্মিত হয়। তরুণ-তরুণীরা লাভ পয়েন্টে গিয়ে তালা লক করে দিয়ে আসেন, যাতে তাদের বন্ধন অটুট থাকে। অনেকে লাভ পয়েন্টে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান, আলাউদ্দিন-লিমার ভালোবাসার গভীরতা তাদেরকেও যেন ছুঁয়ে যায়। পৃথিবীতে মানব-মানবীর শাশ্বত ভালোবাসার মাহাত্ম্য নতুন করে তারা উপলব্ধি করেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পোল্যান্ডের ক্রোকো, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন, ইতালির ভেনিস, ইংল্যান্ডের লন্ডন, স্লোভেনিয়ার জুবলজানান, অস্ট্রিয়ার সার্লসবার্গ, ইতালির ফ্লোরেস, ফ্রান্সের প্যারিসে লাভ পয়েন্ট রয়েছে। রাঙ্গামাটির পলওয়েল পার্কে নির্মিত এটাই দেশের প্রথম লাভ পয়েন্ট।
জেলা পুলিশ, রাঙ্গামাটির তত্ত্বাবধানে কাপ্তাই লেকের কোল ঘেঁসে তৈরি অত্যাধুনিক পলওয়েল পার্ক। অভিনব নির্মাণশৈলী ও নান্দনিকতার ছোঁয়ায় ইতিমধ্যেই এটি রাঙ্গামাটির অন্যতম সেরা বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মেরি গো রাউন্ড, হানি সুইং, মিনি ট্রেন, প্যাডেল বোটসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় রাইড ছাড়াও পলওয়েল পার্কে আছে ভূতুড়ে পাহাড়ের গুহা, পাহাড়ি কৃত্রিম ঝরনা ও কলসি ঝরনা, ক্রোকোডাইল ব্রিজ, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকিশিল্প, লেকভিউ পয়েন্ট, হিলভিউ পয়েন্ট, লাভ পয়েন্ট, মিনি চিড়িয়াখানা, অ্যাকোয়ারিয়াম, ফিশিং পেয়ার, ক্যাফেটেরিয়া, সুইমিংপুল, কার পার্কিং এবং পলওয়েল কটেজ। এছাড়া এই পার্কে পিকনিকসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ রয়েছে। অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশে সময় কাটাতে ও চিত্তবিনোদনের জন্য প্রতিদিনই পলওয়েল পার্কে ভিড় জমান পর্যটকরা। তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো পার্ক।
রাঙ্গামাটির পলওয়েল পার্কে জনপ্রতি প্রবেশ ফি ৩০ টাকা, বিভিন্ন রাইডের ফি ৩০ থেকে ৪০ টাকা এবং সুইমিংপুলের প্রবেশ ফি ২০০ টাকা। পলওয়েল পার্কে ভিভিআইপি ও ভিআইপি কটেজ রয়েছে। কটেজ বুকিংয়ের সঙ্গে রয়েছে সকালের নাস্তা, ফ্রি সুইমিংপুল ব্যবহারের সুবিধা, ফ্রি এন্ট্রি, কার পার্কিং, ফ্রি ওয়াইফাই এবং ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাব্যবস্থা। পলওয়েল পার্কে ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট ব্যবস্থাও রয়েছে।
