ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে অবস্থিত ধলেশ্বরী সেতুর টোল আদায়ে ৯ বছরের অভিযোগ তদন্তে তিনটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে দুটি তদন্ত করেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। আরেকটি তদন্ত কমিটি করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে সওজের দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধলেশ্বরী সেতুতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকা টোল আদায় হলেও সরকারের কোষাগারে যায় মাত্র ৩ লাখ টাকা— এমন ঘটনা ঘটেনি। দিনে গড়ে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা টোল আদায় হয়ে থাকে। আদায়কৃত সমুদয় অর্থই সরকারি কোষাগারে নিয়মিত জমা হয়েছে বলেও এই দুটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনেও প্রায় অভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
ধলেশ্বরী সেতুতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকা টোল আদায় হলেও সরকার পাচ্ছে মাত্র ৩ লাখ টাকা। এই হিসাবে ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৭০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার। এরকম অভিযোগ নিয়ে গত ১৪ অক্টোবর সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেওয়া হয়।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি একাব্বর হোসেনের সভাপতিত্বে ঐ বৈঠকে কমিটির সদস্য সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ভার্চুয়ালি অংশ নেন। ধলেশ্বরী সেতুতে টোল আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা হবে বলে মন্ত্রীও বৈঠকে উল্লেখ করেন। পরদিন ১৫ অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাকে ‘দিনে টোল ওঠে ৩০ লাখ, সরকার পায় ৩ লাখ টাকা!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্তের বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুজ উদ্দিন খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘পত্রিকায় প্রতিবেদন আসার পরে আমরা অভ্যন্তরীণভাবে দুটি তদন্ত করিয়েছি। দুটি তদন্তেই দেখা গেছে ধলেশ্বরী সেতুতে দিনে গড়ে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা টোল ওঠে। কত টাকা টোল উঠতে পারে সেটি নির্ভর করে ফেরির স্বাভাবিক চলাচলের ওপর। ফেরি স্বাভাবিক চলাচল করলে যানবাহনের সংখ্যাও স্বাভাবিক থাকে। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দিনে ৭ লাখ টাকার মতো টোল আদায় হয়। আর কোনো কারণে ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বা বন্ধ থাকলে যানবাহনের সংখ্যাও কমে যায়, সেক্ষেত্রে ৪/৫ লাখ টাকাও টোল ওঠে। এখানে যে ৩ লাখ টাকার কথা বলা হচ্ছে—সেটি সম্ভবত করোনার সময়ে হতে পারে। কারণ তখন সড়কে যানবাহন খবুই কম ছিল।’ তার দাবি, ‘দিনে ৩০ লাখ টাকা টোল ওঠার অভিযোগটি কাল্পনিক।’
এক প্রশ্নের জবাবে সবুজ উদ্দিন খান জানান, ধলেশ্বরী সেতুতে টোল আদায়কারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো কমিশনের ভিত্তিতে নিযুক্ত করা হয়নি। কথা হচ্ছে—যত টাকা টোল উঠবে সব টাকাই সরকারি কোষাগারে জমা হবে। আর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাসে নির্ধারিত অর্থ পাবেন। বিষয়টি এভাবেই চলছে। তিনি জানান, সাধারণত টোলের বিষয়টি বছরে দুইবার রুটিন চেক করা হয়। এবার করোনার কারণে সেই রুটিন চেকে বিলম্ব হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে সবুজ উদ্দিন খান জানান, টোল আদায়কারী বর্তমান অপারেটর সর্বোচ্চ জুন পর্যন্ত থাকবে। যেহেতু ধলেশ্বরী সেতু এখন এক্সপ্রেসওয়েতে যুক্ত হয়েছে, তাই নতুন আইন অনুযায়ী এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে টোল আদায় করা হবে। নতুন আইন অনুযায়ী ব্রিজের সঙ্গে সড়ক ও যানবাহনের টোলও যুক্ত হবে। এই টোল হার নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। টোল হার নির্ধারণের পর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এমনকি তখন কেন্দ্রীয়ভাবে টোল আদায় প্রক্রিয়া মনিটরিং করা হবে।
সংসদীয় কমিটি সূত্রে প্রাপ্ত কাগজপত্রে দেখা যায়, ধলেশ্বরী সেতুর টোলে অনিয়মের বিষয়ে কমিটির সভাপতি বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ আসে। এতে উল্লেখ করা হয়, টোল আদায়ে নিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘এমএম বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর সঙ্গে বিধিবহির্ভূতভাবে দুইবার চুক্তি নবায়ন করা হয়। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের টোল অধিশাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টোল আদায়কারী অপারেটর বরং অনাগ্রহী। নতুন আইনে টোল হার নির্ধারণের পর ডিজিটাল পদ্ধতিতে টোল আদায়ের দরপত্র আহ্বানের আগ পর্যন্ত অপারেটর হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে অপারেটরকে অনুরোধ করা হয়েছে।
