অণুগল্প

অকুপেশনাল হ্যাজার্ড

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮:৫১

 

গুলিস্তানে জ্যামে আটকে আছি প্রায় আধা ঘণ্টা। পকেট থেকে ফোন বের করে এলোমেলো স্ক্রলিং করছিলাম। হঠাত্ করে হাতে হ্যাচকা টান পড়ল। জানালা দিয়ে কেউ একজন ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে পালাচ্ছে!

ঘটনার আকস্মিকতা কেটে গেলে ‘চোর চোর’ বলে চিত্কার করতে করতে বাস থেকে নেমে দৌড় দিলাম। ইতিমধ্যে বাসের হেলপার ছিনতাইকারীকে ধরে ফেলেছে। আমি যেতে যেতেই উত্সাহী জনতা আসন্ন গণপিটুনির প্রস্তুতি নিচ্ছে! ছিনতাইকারীটা ফোনটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে ভয়ে। আমিও সেই গণপিটুনিতে অংশ নিতে গেলাম। কিন্তু উত্সাহিত জনতার ভিড়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারলাম না। এক ফাঁকে সুযোগ পেয়ে বদমাইশটার পকেটে হাত দিলাম। বেশ মোটাসোটা, স্বাস্থ্যবান মানিব্যাগের অস্তিত্ব আবিষ্কার করলাম। মানিব্যাগটা বের করে নিয়ে আমি চলে আসি।

জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে। বাসে বসে মোবাইলফোনটা দেখতে লাগলাম। স্ক্রিন ফেটে গিয়েছে বাজেভাবে। বেশ কয়েক বছর আগের পুরনো ফোন। এই মুহূর্তে নতুন ফোন কেনার সামর্থ্য নেই আমার।

বাসায় ফিরে মানিব্যাগটা নিয়ে বসলাম। বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় ভিজিটিং কার্ড আর সব মিলিয়ে নগদ ১৭৬৩২ টাকা! মানিব্যাগটা নিয়ে আসার সময় বেশ অপরাধবোধ কাজ করছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে কেন যেন সেই পাপবোধ কাজ করছে না। ১৭৬৩২ টাকা আমার কাছে অনেক টাকা। আমি নিতান্তই গরিব ছাপোষা চাকরিজীবী। বেতন পেতেও অর্ধেক মাস বাকি। প্রকৃতিই তাই হয়তো দয়া করে আমাকে নতুন মোবাইলফোন কেনার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

 

বেশ কয়েকমাস পরের কথা। কারওয়ানবাজারে অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে আনমনে সিগারেট টানছিলাম।

‘ব্রাদার, আগুন হবে?’

মাঝবয়েসি এক লোক, প্রথমে চিনতে পারিনি। হঠাত্ করে মনে পড়ল, আমার মোবাইলফোন ছিনতাই করা সেই লোক! বেশ অস্বস্তি নিয়ে লাইটার এগিয়ে দিলাম।

‘ভাই, আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?’

লোকটা আমার আপাদমস্তক দেখল। ভুস করে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘না ব্রাদার, কেডা আপনে?’

খানিকটা অবাক হলাম! লোকটা আসলেই চিনতে পারেনি!

‘আপনি সত্যিই আমাকে চেনেন নাই?’

‘না, কন দেহি ভাই, আপনি কেডা?’

‘আপনি কয়েকমাস আগে বাস থেকে আমার মোবাইলফোন টান দিয়েছিলেন। বাসের হেলপার আপনাকে ধরে ফেলে। রাস্তার মানুষজন প্রচণ্ড মার...’

মুখ থেকে একদলা থুতু ফেলে নিতান্তই ভাবলেশহীনভাবে লোকটা বলল, ‘ওহ, হেই কথা...হোনেন ভাই, সব লাইনেই খারাপ দিন-ভালো দিন আহে। অইদিন কপাল খারাপ গ্যাছে, মাইর খাইছি, ইনকাম হয় নাই। একদিন খারাপ গ্যাছে, আরেকদিন ভালো ইনকাম হইবো। তয় আপ্নের কথা আমার স্মরণে নাই, রাস্তাঘাডে কতদিনই তো মাইর খাইলাম।’

লোকটার জ্ঞান-বুদ্ধি আর প্রফেশনালিজমে বেশ চমত্কৃত হলাম। ছিনতাইকারী হলেও পেটে বিদ্যা-বুদ্ধি আছে!

লোকটা কাঁচাবাজারের দিকে মিলিয়ে গেল। আমিও অফিসের দিকে হাঁটা দিলাম। লিফটে উঠে কী মনে করে প্যান্টের পকেটে হাত দিলাম। মানিব্যাগ নেই। অসতর্ক মুহূর্তে মানিব্যাগ হাওয়া করে দিয়েছে লোকটা। মনে মনে হাসলাম। বেতন হয়নি, শতছিন্ন মানিব্যাগটাতে ১০০ টাকার একটা ছেঁড়া অচল নোট ছাড়া কিছুই নেই...

অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য