বিশেষজ্ঞ সমাচার

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৫৭

ঐতিহাসিকেরা বিভিন্ন যুগকে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করেছেন। যেমন প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ, আধুনিক যুগ ইত্যাদি। আবার নৃতাত্ত্বিকেরা হাতিয়ার আবিষ্কার ও এর ক্রমবিকাশের ধারা অনুযায়ী মানবসভ্যতার বিকাশকে প্রস্তর যুগ, তাম্র যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ ও লৌহ যুগ নামে অভিহিত করেছেন। ঠিক তেমনিভাবে বর্তমান যুগকে আমরা ‘বিশেষজ্ঞের যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। এখন সবাই বিশেষজ্ঞ। সবখানে বিশেষজ্ঞ। বিশেষজ্ঞ কাকে বলে? সাধারণভাবে যে ব্যক্তি কোনো বিশেষ বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছেন তাকে বিশেষজ্ঞ বলে। যেমন—যিনি বেদ জানেন তিনি ‘বেদজ্ঞ’, যিনি ব্রহ্মকে জানেন তিনি ‘ব্রহ্মজ্ঞ’, যিনি শাস্ত্র জানেন তিনি ‘শাস্ত্রজ্ঞ’, যিনি সর্ব (সবকিছু) জানেন তিনি ‘সর্বজ্ঞ’, যিনি গণিত জানেন তিনি ‘গণিতজ্ঞ’, যিনি সংগীত জানেন তিনি ‘সংগীতজ্ঞ’, যিনি আইন জানেন তিনি ‘আইনজ্ঞ। একইভাবে যিনি বিশেষ (বিশেষ কিছু) জানেন তিনি ‘বিশেষজ্ঞ’।

সমাজে বিশেষজ্ঞদের রয়েছে বিশেষ কদর। বিশেষ করে টিভি টকশোতে এখন বিশেষজ্ঞদের জয়জয়কার। বিভিন্ন টকশোতে বিশেষ বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের ডেকে আনা হয়। তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মত প্রদান করেন। তবে বর্তমানের এই ভেজালের যুগে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও ভেজাল দেখা দিয়েছে। এখন আসলের চেয়ে নকল বিশেষজ্ঞের ভিড় বেশি। আর তাই বিশেষজ্ঞের সংজ্ঞাও পালটে গেছে। এখন চালাক মানুষেরা ‘কোনো বিষয়ে বিশেষভাবে অজ্ঞ যিনি’ তাকেই বিশেষজ্ঞ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ফলে বিশেষজ্ঞদের এখন বাঁকা চোখে দেখা হয়।

সুসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেছেন। ‘মিসির আলী’ সিরিজে আমরা মিসির আলীকে বলতে শুনি, ‘বিশেষজ্ঞদের কিছু জিগ্যেস করলেই তারা এমন ভঙ্গিতে তাকান, যেন প্রশ্নকর্তার অজ্ঞতায় খুব বিরক্ত হচ্ছেন। প্রশ্ন পুরোপুরি না শুনেই জবাব দিতে শুরু করেন। সেই জবাব বেদবাক্যের মতো গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের জবাবের ওপর প্রশ্ন করা যাবে না। বিনয় নামক সদগুণটি বিশেষজ্ঞদের নেই। দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে তারা যা শেখেন তার চেয়ে অনেক বেশি শেখেন অহংকার প্রকাশের কায়দাকানুন।’

তবে সবাই এক রকম নন। বিনয়ী, জ্ঞানী বিশেষজ্ঞও আমাদের সমাজে আছেন। যদিও তাদের নিয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। তারা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যান। তাছাড়া আমাদের দেশে প্রকৃত জ্ঞানী-গুণীর কদর নেই। অনেক মানুষ আছেন, যারা বিশেষজ্ঞদের মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে পারেন না।

তো একবার অল্পশিক্ষিত ধনী অহংকারী ব্যক্তি গিয়েছেন এক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের কাছে। চিকিত্সক তাকে ‘লোকাল অ্যানেসথেসিয়া’ দিয়ে অপারেশনের কথা শোনাতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘আমার টাকাপয়সার অভাব নেই; আপনি লোকাল জিনিসের পরিবর্তে বিদেশি ইমপোর্টেড জিনিসের ব্যবস্থা করুন।’ আরেক নব্য ধনী বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের কাছে গেলে চিকিত্সক যখন প্রশ্ন করলেন, আপনার অসুখটা কী? তখন তিনি উদ্ধত ভঙ্গিতে বললেন, সেটা আপনিই তো নির্ণয় করবেন! চিকিত্সক তখন বললেন, তাহলে আমাকে একটু সময় দিতে হবে। আমার এক বন্ধু আছেন পশুচিকিত্সক। তাকে টেলিফোন করে আনাই; তিনি প্রশ্নোত্তর ছাড়াই ব্যবস্থাপত্র দিতে সক্ষম।

তবে সব বিশেষজ্ঞ এমন রসিক নন। বেরসিক বিশেষজ্ঞও সমাজে অনেক আছেন। আমাদের দেশে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অনেক মজার গল্প প্রচলিত রয়েছে। তার দু-একটি উল্লেখ করা যাক।

একবার ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ গিয়েছেন বান্দরবানের রুমা উপজেলার এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় কাজুর চাষ পর্যবেক্ষণ করতে। সেখানে পরীক্ষামূলক কাজুর চাষ শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ সাহেবের কাজু বিষয়ে অনেক জ্ঞান। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। সম্প্রতি তানজানিয়া থেকে কাজু চাষের ওপর নাকি ছয় মাসের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও নিয়ে এসেছেন।

বিশেষজ্ঞ সাহেব সপারিষদ এক শীতের দুপুরে রুমায় গেলেন। এই ঠান্ডার দিনেও খালি গায়ে রোদ্দুরে বসে গ্রামের এক কৃষক তামাক সেবন করছিলেন। হঠাত্ তার বাড়ির সামনে সম্ভ্রান্ত লোকজন দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তাকে দেখে বিশেষজ্ঞ সাহেব বেশ উত্সাহের সঙ্গে এগিয়ে এলেন, যে গাছটায় এতক্ষণ কৃষক হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, সেটার দিকে ইশারা করে জিগ্যেস করলেন, ‘এই গাছটার গোড়া অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে নিড়িয়ে, খুঁড়ে দিয়েছিলেন?’

এই প্রশ্ন শুনে কৃষক কেমন থমকে গেলেন। কিছু বলার আগেই বিশেষজ্ঞ মহোদয়ের একজন পারিষদ বাংলা করে বুঝিয়ে দিলেন, ‘অক্টোবর, মানে ঐ আশ্বিন মাসে গাছটার গোড়াটোড়াগুলো বেশ সাফ করে দিয়েছিলেন কিনা?’

কৃষক বললেন, ‘না।’

এবার বিশেষজ্ঞ সাহেব বললেন, ‘তা-ই বলি!’ তারপর একটু থেমে আবার কৃষককে জিগ্যেস করলেন, ‘গাছটার ওপরের ডালগুলো এর মধ্যে কোনো দিন ভালো করে পোকা মারার ওষুধ দিয়ে স্প্রে করে দিয়েছেন?’

কৃষকের মুখ দেখে বোঝা গেল, তিনি সাত জন্মে এরকম কিছু শোনেননি। জেরার জবাবে থতমত খেয়ে বললেন, ‘না, না তো!’

‘তখনই বলেছিলাম।’ বিশেষজ্ঞ সাহেব গজরাতে গজরাতে বলে উঠলেন, ‘সাধে এই অবস্থা?’ তারপর উত্তেজিত হয়ে কৃষকের সামনে দুই পা এগিয়ে গিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘আর কিছু না করুন, এই শীতের মধ্যে, বৃষ্টির আগে গাছের ওপরের পাতাগুলো একবার ছেঁটে দেবেন তো?’

একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির এ রকম মারমুখো ভাব দেখে ইতিমধ্যে কৃষক রীতিমতো ঘাবড়ে গেছেন এবং ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তিনি কোনো রকমে জবাব দিলেন, ‘জি, না।’

মাথায় হাত দিয়ে বিশেষজ্ঞ সাহেব মাটিতে বসে পড়লেন, ‘এইভাবে নিজের সর্বনাশ কেউ করে! আমি অবাক হয়ে যাব, যদি আপনি এই গাছে এক কেজির বেশি কাজু বাদাম পান।’

একটু দম নিয়ে কৃষক তার হাতের হুঁকোতে দু-তিন বার জোরে জোরে টান দিলেন, কিন্তু আগুন নিবে গেছে, ধোঁয়া বেরোল না। নিরাশ কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘আমিও খুব অবাক হব।’

এই নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ সাহেবের মুখে আর বাক্য জোগাল না, একজন পারিষদ তাকে সাহায্য করলেন, কৃষককে পালটা জিগ্যেস করলেন, ‘আপনিও অবাক হবেন?’

এইবার কৃষক বেশ ধাতস্থ হয়েছেন, কোমর থেকে দেশলাই বের করে হুঁকোটা ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘অবাক হব না? এটা হলো শ্যাওড়া গাছ, এই শ্যাওড়ায় এক কেজি কেন, যদি একটা কাজু বাদামও হয়, নিশ্চয়ই অবাক হব, খুবই অবাক হব।’

ওপরের গল্পটি সম্পূর্ণ বানানো। এর সঙ্গে কোনো জীবিত ব্যক্তি বা প্রকৃত ঘটনার কোনো সংযোগ নেই।

বরং বিশেষজ্ঞ সম্পর্কে সেই সাঁতারের শিক্ষকের গল্পটি একবার স্মরণ করা যাক। গল্পটি বাংলা ভাষায় অনবদ্য ভঙ্গিতে লিখেছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। গল্পটা রীতিমতো চওড়া, অন্তত শিবরাম চক্রবর্তীর কলমে। বিস্তারিত বর্ণনা থাক, আসল ঘটনা এই রকম :সাঁতারের বিখ্যাত ইশকুলের সাঁতার শিক্ষকেরও খুব খ্যাতি। তিনি শিক্ষার্থীদের নানা রকম নির্দেশ দেন, তারই নির্দেশে কতজন যে দক্ষ সাঁতারুতে পরিণত হয়েছে অতি আনাড়ি অবস্থা থেকে, তার হিসাব নেই। একদিন হঠাত্ জলে পড়ে গেলেন শিক্ষক মশায়। তিনি তীর থেকে নির্দেশ দিতেন, কিন্তু সেদিন কী করে যেন পাড় থেকে জলে পড়ে গেলেন। তারপর নাকানি-চুবানি খেয়ে ডুবে মরেন আরকি! সেদিনই প্রকাশ পেল তিনি সাঁতার একদম জানেন না, জীবনে কখনো জলে নেমেছেন কি না, তা-ই সন্দেহ। অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সাঁতার শেখাতে গেলে সাঁতার জানতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।

ইংরেজিতে বলা হয়, কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ের আরো-আরো-আরো জানতে জানতে অবশেষে এভরিথিং অব নাথিং জানাই হলো বিশেষজ্ঞের বা পণ্ডিত শ্রেষ্ঠের স্বপ্ন। এই নাথিং কিন্তু ঠিক নাথিং নয়, দু-একটা উদাহরণ দিচ্ছি। মনে করুন, একজনের বিষয় হলো মৌর্য যুগের স্বর্ণমুদ্রার সিংহের ডান পায়ের (সামনের) মধ্যমার দৈর্ঘ্য। ইনি কিন্তু এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ১০ হাজার পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছেন। ইনি ইতিহাসের লোক। তারই বন্ধু সাহিত্যের, তার বিষয় হলো শিলাইদহের কুঠিবাড়ির মধ্যের ঘরের বড় শালকাঠের জলচৌকিটির পায়ার কাছে যে কালির দাগ লেগে ছিল, সেই মসিচিহ্ন কি শিলাইদহ বোটে জলচৌকিটি নিয়ে ‘সোনার তরী’ কবিতাটি লেখার সময় (যদি নেওয়া হয়ে থাকে) দোয়াত উলটে লেগে গিয়েছিল? এই বক্তব্যের পক্ষে এবং বিপক্ষে তিনি একশ রকম তথ্য ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছেন।

এখন বিশেষজ্ঞ মানে ভাগ আর ভাগ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে জ্ঞান। বিশেষ করে চিকিত্সাক্ষেত্রে। আগে আমরা ডাক্তার বলতে বুঝতাম যে কোনো রোগের নিদানদাতা। তখনকার দিনে একজন ডাক্তার পায়ের গোড়ালি থেকে মস্তকের ব্রহ্মতালু পর্যন্ত সর্বাঙ্গের চিকিত্সা করতেন। ডাক্তার মানে এখন আর যে কোনো রোগের নিদানদাতা নন। কানে সমস্যা হলে যেতে হবে ই-এন-টি স্পেশালিস্টের কাছে, অর্থাত্ নাসিকা-কর্ণ-কণ্ঠ বিশেষজ্ঞের কাছে। আবার নাকে সমস্যা হলে তার চেম্বারে গেলে শোনা যায়, ‘স্যার এখন শুধু কান দেখেন। আপনি ডা. আলির কাছে যান। তিনি এখন নাক দেখেন।’ ডা. আলির কাছে গেলে তিনি দেখে-শুনে বলেন, ‘আপনার নাকের ডান পাশে সমস্যা। আমি বাঁ নাক দেখি। আপনি বরং ডা. সিদ্দিকের কাছে যান। উনি ডান কান দেখেন!’

n লেখক :রম্যরচয়িতা