আমরা দেখিয়াছি, দেশে সরকারি কোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শুরু হইয়া যথাসময়ে শেষ হইবার খুব বেশি নজির নাই। প্রায় সকল প্রকল্পের ক্ষেত্রেই দেখা যায় দফায় দফায় সময় বৃদ্ধি অঘোষিত নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহাতে প্রকল্পের ব্যয় বহু গুণে বাড়িয়া যায়। যদিও প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাইলে তাহার বেনিফিশিয়ারি অনেকেই হইয়া থাকে। দেশ স্বাধীন হইয়াছে প্রায় পাঁচ দশক পূর্বে। এত বত্সর ধরিয়া এই ধারাই বহমান ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া বর্তমান সরকারপ্রধান প্রায়শই উষ্মা প্রকাশ করিয়া থাকেন প্রকল্প বিলম্বের কারণে। একটি পুরাতন সড়কের প্রশস্তকরণের মতো সাধারণ কাজও দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে ফেলা হয়। কেন? দেশের নির্বাহীরও একই জিজ্ঞাসা। এই সাধারণ কাজেও কেন আবার সংশোধন, আবার টাকা বাড়াইতে হইবে? কতদিন চলিবে এই ধারা? আশার কথা হইল, দেশ স্বাধীনের পাঁচ দশকে কেহ এই প্রশ্ন তুলেন নাই, কিন্তু বর্তমান নির্বাহী সেই প্রশ্ন বারংবার তুলিয়া ধরিতেছেন। এই সদিচ্ছার সুফল ভবিষ্যতে মিলিবে নিশ্চয়ই।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন বিলম্ব হয়, আমরা ইহার কারণ বুঝিয়া দেখিতে চেষ্টা করিতে পারি। ইহাতে গোষ্ঠীগত স্বার্থ তো রহিয়াছেই, আরো রহিয়াছে ব্যবস্থাগত জটিলতা। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যান্ত্রিক প্রকৌশলী হেনরি লরেন্স গান্ট প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণের কিছু জনপ্রিয় কৌশল আবিষ্কার করেন। ব্যবস্থাপনার কাজকে সকলের জন্য সহজতর করিয়া দেন। বর্তমানে আরো ব্যাপক গবেষণার ফল হিসাবে সমগ্র বিশ্বেই প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় আসিয়াছে আমূল পরিবর্তন। এমনকি ব্রিটিশরা আমাদের যেই প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো শিখাইয়া দিয়া গিয়াছে, যুগের পরিবর্তনের পাশাপাশি সেই ব্রিটিশরাও এখন নিজেদের ব্যবস্থাপনাকে যুগোপযোগী করিয়াছে, হালনাগাদ করিয়াছে। কিন্তু আমাদের মূল কাঠামে একই তিমিরে রহিয়া গিয়াছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার উল্লেখযোগ্য জটিল অংশটি হইল ফাইল প্রসেসিং। বিভিন্ন হাত ও টেবিল কয়েক দফা ঘুরিয়া তাহার পর প্রকল্প পাশ হয়। ইহা একটা জটিল হিসাব। প্রকল্পের ফাইলও অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করে। এইখানে ফাইল এসও, এসডি, প্রধান প্রকৌশলী, প্রশাসন, টেকনিক্যাল কমিটি, বিভিন্ন স্তরের সচিব হইয়া প্ল্যানিং সচিব এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর টেবিল ঘুরিতে থাকে। তাহার পর দেখিতে হয় প্রকল্পের জন্য টাকা আছে কি না, যাচাই-বাছাই করিয়া ফেরত পাঠানো হয় অধিদপ্তরে, প্রি-একনেকের পর একনেকে প্রকল্প যাচাই হয়। অতঃপর তাহার দরপত্র প্রকাশের পর শুরু হয় অন্য খেলা। অনেক ক্ষেত্রেই অপরের লাইসেন্সে ভাগবাঁটোয়ারা করিয়া কাজ করা, অন্যের নিকট কাজ বিক্রয় করিয়া দেওয়া, বিলম্বে কাজ শুরু করা, কিছুটা কাজ করিয়া বিলের টাকা তুলিয়া পুনরায় কাজ বন্ধ রাখা—এইগুলি খুব সাধারণ চিত্র। ইহা ছাড়াও প্রকল্পে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না করা, দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, ডিপিপি তৈরির সময় দ্রব্যের মান ও মূল্য নির্ধারণে অদূরদর্শিতা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নূতন নূতন অঙ্গ সংযোজনের সমস্যা তো রহিয়াছেই। সুতরাং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব না হইবার কোনো কারণ নাই। স্পষ্টতই, ইহাতে দুর্নীতির শিকড়ও বৃদ্ধি পাইতে থাকে। অপচয় হয় রাষ্ট্রীয় অর্থের।
প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে সরকারি কাজে উন্নত বিশ্বে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আসিয়াছে। কতিপয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ না দেখিয়া এই সমস্যা হইতে আমাদেরও বাহির হইয়া আসিতে হইবে। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের এক রাজনীতিক কোনো একসময় দেশটির অবস্থা দেখিয়া বলিয়াছেন—দেশটিকে খোদা হেফাজত করিবেন। বাংলাদেশকেও নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ হেফাজত করিবেন।
