চলছে ছাঁটাই আতঙ্ক কাজ হারাচ্ছে মানুষ

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৪৭

এ বছরের গোড়ার দিকে করোনা যখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল, তখন বলা হচ্ছিল জীবিকা নয় জীবন সবার আগে। কিন্তু অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে দেখা যাচ্ছে করোনার আঘাতে বাংলাদেশসহ বিশ্ব জুড়েই মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। বেসরকারি খাতে কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান করোনাকালে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কর্মী ছাঁটাই করছে। জীবিকার অভাবে এই ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের জীবনও এখন হুমকির মুখে। এ পরিস্থিতি কাটাতে সরকারকে কর্মহীন জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক সহযোগিতা কাঠামো বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

এই বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। এ বছর দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘ঘুরে দাঁড়াব আবার, সবার জন্য মানবাধিকার’। দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে পালিত হবে।

এই করোনাকালে একদিকে বিশ্বের মানুষ যেমন কোভিড-১৯-এর সঙ্গে লড়াই করছে, অপর দিকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেও হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে লকডাউন উঠে যাওয়ার পরেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আগের সেই গতিশীলতা আর নেই। আর সে কারণ দেখিয়ে কর্মচারীদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। এমনকি বেতন-ভাতা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু যে ছাঁটাই হচ্ছে তা নয়, কমে গেছে নতুন চাকরির সুযোগ। প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মীও নিয়োগ দেওয়া বন্ধ রেখেছে। ফলে দিন দিন বেকারত্ব সমস্যা প্রকট হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম ইত্তেফাককে বলেন, গার্মেন্টস খাতসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অমানবিক ছাঁটাই চলছে। আমরা বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের ছাঁটাই বন্ধের জন্য নোটিস দিয়েছি। তিনি বলেন, মালিক শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যে কর্মচারীরা কাজ করেন তাদেরকে অবলম্বন করেই তাদের আয়। এই সময় অমানবিকের মতো কর্মী ছাঁটাই না করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, মহামারি মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা ছিল। এর ফলে সক্ষমতার সঠিক ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। ‘জীবন বনাম জীবিকা’র একটি ভুল বিতর্কে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া আবর্তিত হয়েছে, অথচ এটি হওয়া উচিত ছিল ‘জীবন ও জীবিকা’। ফলে ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীর সুবিধা বিবেচনা করা হলেও, সাধারণ জনগণের সুবিধা বিবেচনায় যে ধরনের ঐকমত্যের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন দরকার ছিল, তা হয়নি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন চাকরি তো নেই, যারা ছিল, তাদেরও ছাঁটাই করা হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তরুণ কর্মীদের ওপর। যতদিন পর্যন্ত অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় না আসছে ততদিন এই জনগোষ্ঠীর শ্রমবাজারে প্রবেশ করাটা কঠিন হবে। এমনকি করোনা পরবর্তী সময়েও যেসব কাজের সৃষ্টি হবে, সেগুলোর ধরন কিন্তু অন্যরকম হবে। এখন যেমন বেশির ভাগ কাজকর্ম ঘরে বসে হচ্ছে। ফলে আগামী দিনেও ডিজিটাল বা আইটিবেইজড কাজ বেশি হবে। এ কারণে গতানুগতিক শিক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়া যাবে না। বাজার উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ, সেই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার দরকার হবে।

এদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি বলছে, চলমান কোভিড-১৯ মহামারিতে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি নানামুখী অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আয় ও ভোগ বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০ সালে দেশে আয় বৈষম্যর গিনি সূচক ০.৫২, যা ২০১৬ সালে ছিল ০.৪৮। ভোগের ক্ষেত্রেও এ বছর বৈষম্য বেড়ে হয়েছে গিনি সূচক ০.৩৫, যা ২০১৬ সালে ছিল ০.৩২।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে যুক্ত হয়। দেশে বেকারত্বের হার অনেক। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে সেই সংকট আরো বেড়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ আর ২৭ লাখ বেকার। আর সম্ভাবনাময় কিন্তু সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ পান না এ রকম ব্যক্তি যাদের ছদ্ম- বেকার বলা হয়, এরকম মানুষ রয়েছে প্রায় ৬৬ লাখ। এরা চাহিদামাফিক কাজ না পেয়ে টিউশনি, রাইড শেয়ারিং, বিক্রয় কর্মী হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ করেন।

বাংলাদেশে এমনিতেই বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ, যুব বেকারত্বের হার ১১.৬ শতাংশ। করোনা ভাইরাসের কারণে জুন ২০২০ সাল নাগাদ সেটি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, করোনা ভাইরাস সংকটে বিশ্বে প্রতি ছয় জনের একজন বেকার হয়েছে আর বাংলাদেশের প্রতি চার জন যুবকের মধ্যে একজন কর্মহীন হয়েছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই এই বেকারত্ব বাড়ছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অপ্রত্যক্ষ করের ওপর বেশি চাপ না দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, চলমান মহামারির ফলে, দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ, যারা দৈনিক ও চুক্তিভিত্তিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল, তারা এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক শঙ্কার মধ্যে পড়েছেন। একই সঙ্গে প্রবাসী কর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে ফিরে এসেছেন এবং অনেকে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে প্রবাসী কর্মীসহ দেশের কর্মহীন জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের একটি আর্থিক সহযোগিতা কাঠামো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, জাতিসংঘ ঘোষিত ৬৮তম বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের উদ্যোগে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ সদস্যভুক্ত দেশগুলো বিশ্ব মানবাধিকার দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করে আসছে।