ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানার্জন একটি ফরজ কর্তব্য। পবিত্র কুরআনের ৭৫৬টি আয়াতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্লেষণে প্রমাণিত, জ্ঞানার্জন একটি সার্বক্ষণিক ইবাদত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় মুসলিম ব্যক্তিত্বদের জানার মধ্য দিয়ে আমরা খুঁজে পাব ইসলামের সোনালি অতীত। এসব মহামানব শুধু ইসলামের গর্ব নন বরং তারা মানবজাতির অহংকার। যেমন:
জাবির ইবনু হাইয়্যান (৭২২—৮০৪ খ্রি:)
মুসলিমবিজ্ঞানী জাবির ইবনু হাইয়্যান, তিনি রসায়ন শাস্ত্রের পথিকৃত্। রসায়ন শাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান এবং আরবিতে রসায়নবিদকে ‘আল কেমি’ বলবার সূত্র থেকেই রসায়ন শাস্ত্রকে ইংরেজিতে কেমেস্ট্রি বলা হয়। বিজ্ঞানী জাবির ইবনু হাইয়্যানের পুরো নাম জাবির ইবনু হাইয়্যান আল-আজদি আস সুফি আল-অমাবি। তিনি নিজস্ব গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। ঐতিহাসিক সত্য, তার প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগারটিই হলো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত প্রথম রসায়ন শাস্ত্রের গবেষণাগার।
বিজ্ঞানী জাবির ইবনু হাইয়্যানই সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রসায়নের প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলো চর্চা-বিশ্লেষণের উপায় আবিষ্কার করেন। রসায়ন ছাড়াও খনিজ পদার্থ, চিকিত্সা, দর্শন, জ্যামিতি, মহাকাশ গবেষণা, যুদ্ধবিদ্যা ইত্যাদিতে বিজ্ঞানী জাবির ইবনু হাইয়্যান যথেষ্ট পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও পারদর্শী ভূমিকা পালন করেন। এসব শাস্ত্রেরও মৌলিকতত্ত্বের দ্বার তিনিই উন্মোচিত করেন। চিকিত্সাসংক্রান্ত ৫০০ গ্রন্থসহ তিনি তার সূত্রগুলোর ওপর অসংখ্য মৌলিক রচনা সম্পাদনা করেন, যার সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। এগুলোর মধ্যে ২৬৭টি রসায়নবিষয়ক। তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে কিতাব আল-তাজমি, আল-রাহমাহ্, আল-শারাকি অন্যতম।
বিজ্ঞানী জাবির ইবনু হাইয়্যানই রসায়নের প্রধান দুটি সূত্র Caltination (ভস্মীকরণ) ও Reduction (লঘুকরণ) এর বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেন। তিনি রাসায়নিক সূত্র ও পদ্ধতির ব্যবহারিক রূপ দেন। তিনি ধাতুর মানগত উন্নতিবিধান, স্টিল ও লোহা তৈরি, মারকাসাইট থেকে লেখার স্থায়ী কালি তৈরি, চামড়া ও কাপড় রং করা, কাপড়কে ওয়াটার প্রুফ করা, লোহা সংরক্ষণের বার্নিশ, ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড থেকে কাচ, সোনালি অক্ষরে লেখার জন্য লৌহ পাইরিটসের ব্যবহার, অ্যাসিডের ঘনত্বের জন্য অম্লরস চোলাই করার পদ্ধতি এবং লবণ তৈরির সফল ব্যাবহারিক পদ্ধতি ইত্যাদি উদ্ভাবন করেন।
আল বিরুনি (৯৭৩—১০৪৮ খ্রি:)
পারস্যের মুসলিম তত্ত্ববিদ আল বিরুনি। পুরোনাম আবু রায়হান আল বিরুনি। মুসলিম এ বিজ্ঞানী তার সংগৃহীত বিভিন্ন প্রকারের শতাধিক ধাতু ও রত্নপাথর নিয়ে গবেষণা করেন। আল বিরুনির প্রচেষ্টায় বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নতুন নতুন ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। তিনি ভূবিদ্যার পথিকৃত। তিনিই স্থিতিবিদ্যা ও গতিবিদ্যার সমন্বয় করে বলবিদ্যানামক নতুন গবেষণা ক্ষেত্রের উন্মেষ ঘটান। আল বিরুনির গণিতশাস্ত্রেও অনন্য অবদান ছিল। এক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠতম অবদান আল কানুন আল মাসইদি।
ইবনু সিনা (৯৮০—১০৩৭ খ্রি:)
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম দার্শনিক ও সুবিখ্যাত চিকিত্সাবিজ্ঞানী আবু আলি সিনা ৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে বুখারায় জন্মগ্রহণ করেন। তখন বুখারা ইরানের অন্তর্গত ছিল। ইবনু সিনা দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, হিসাববিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, সাধারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমান প্রজ্ঞতা অর্জন করেন। এতেই ইবনু সিনা যে কত বড় মাপের বিদ্যান ও চিকিত্সক ছিলেন তা বোঝা যায়। কেননা, মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি সমসাময়িক জ্ঞানী-গুণী মনীষী ও চিকিত্সককে পাঠদান করেছেন।
একজন বিখ্যাত চিকিত্সাবিজ্ঞানী হিসেবে সর্বত্র তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি আল মুজমুয়া নামক একটি বিশ্বকোষ সম্পাদনা করেন। এতে তিনি গণিত ছাড়া সব বিষয় লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ইবনু সিনা পদার্থ, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যামিতি, গণিত, সাহিত্য ও চিকিত্সাশাস্ত্রের শতাধিক মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। চিকিত্সাশাস্ত্রে তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘কানুন ফিত তিব’ এ গ্রন্থে ৭৬০টি ওষুধ ও চিকিত্সা পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। এ মৌলিক কর্মটি যেমন তাকে অমরত্ব দিয়েছে তেমনি তা অনাগত গবেষকদের জন্যও দিশারি হয়ে থাকবে। এজন্যই ইউরোপীয় চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা ইবনু সিনাকে বলেছেন মাস্টার অব মেডিসিন (Master of Medicine).
ওমর খৈয়াম (১০১৯—১১৩৫ খ্রি:)
ওমর খৈয়াম সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর কিছুকাল আগে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খোরাসানের অন্যতম বিখ্যাত ওস্তাদ ইমাম মোয়াফে্ফক নিশাপুরীর শিষ্যত্ব লাভ করেন। দিনের বেলায় জ্যামিতি ও বীজগণিত পড়ানো, সন্ধ্যায় মালিক শাহ্র রাজদরবারে পরামর্শকের দায়িত্ব পালন এবং রাতে মহাকাশ চিন্তার পাশাপাশি, তত্কালীন বহুল প্রচলিত ‘জালালি বর্ষপুঞ্জি’ সংশোধনসহ সব কাজেই তিনি পরম নিষ্ঠা ও যত্নের ছোঁয়া রেখে গেছেন। ওমর খৈয়াম তার জীবদ্দশায় একজন গণিত বিশারদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনিই সর্ব প্রথম উপবৃত্ত ও বৃত্তের ছেদকের মাধ্যমে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান সূত্র আবিষ্কার করেন। ওমর খৈয়ামের অন্য একটি বড় অবদান, ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্যের সমালোচনা; যা পরবর্তীকালে অ-ইউক্লিডিয় জ্যামিতির সূত্রপাত ঘটায়। ১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল মাকালাত ফি আল জার্ব আল মুকাবিলা’ প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে তিনি ঘাত হিসেবে সমীকরণের শ্রেণীকরণ করেন এবং দ্বিঘাত সমীকরণের নিয়মাবলি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সরলভাবে লিপিবদ্ধ করেন। [ চলবে ]
lলেখক :বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর
