বিজয় ও মুক্তি

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:২৭

ঘাসের ঝোপে চুপসে আছে চপল প্রজাপতিদের ডানা। পাখির ঠোঁটে গান নেই। কখনো পাতার আড়ালে লুকোচ্ছে, কখনো বা ছটফট করে উড়ছে এদিক ওদিক। করুণ সুরে হাম্বা হাম্বা করে দৌড়াচ্ছে বাছুরগুলো। থেমে গেছে শিশুদের হাসি। সোনা সোনা কোমল মুখগুলো কেমন ফ্যাকাশে মনে হচ্ছে। প্রাণটি হাতে নিয়ে চলাচল করছে মানুষ। কারণ, একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে তখন। পাকি হায়েনাদের উত্পাতে চারদিকে ভয় কিলবিল করছে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা উচিত জবাব দিচ্ছে ওদের।

যুদ্ধে যোগ দিয়েছে রায়হান। সবুজপুরের সাহসী এক তরুণ সে। জীবন বাজি রেখে লড়ে যাচ্ছে। বাড়িতে রেখে গেছে মা আর স্ত্রীকে। রায়হান যুদ্ধে যাবার সময় স্ত্রীর কাছে খুব খুশির একটা সংবাদ জেনে গেছে। বাবা হতে চলেছে রায়হান। সে ভাবছে, যত কষ্টই হোক, প্রাণ যায় যাক, তবুও দেশটা স্বাধীন করতেই হবে। তা না হলে মাকে কী জবাব দেবে? তার সন্তানও যেন ভয়হীন স্বাধীন একটা দেশ পায়। ফুলের মতো হেসে হেসে, ফড়িংয়ের মতো নেচে নেচে যেন বড়ো হতে পারে।   

রায়হানের মতো বুক ফুলিয়ে যুদ্ধ করছে বাংলা মায়ের লাখো ছেলে। মৃত্যুভয়কে ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিয়ে কাঁপিয়ে তুলছে রণাঙ্গন। সবাই পণ করেছে, একবিন্দুও পিছ পা হবে না। বর্বর পাকিস্তনিদের বাংলা থেকে তাড়িয়ে মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেই তারা। তাদের হূদয়ে এমনই মুক্তিমন্ত্র আর দুরন্ত সাহস বুনে দিয়েছেন শেখ মুজিব।

প্রায় ন’মাস ধরে যুদ্ধ চলছে। অনেকগুলো সম্মুখযুদ্ধে জয়ী হতে প্রবল সাহস দেখিয়েছে রায়হান। তার নাম শুনলেই হানাদারদের রক্ত হিম হয়ে আসে। মুক্তিবাহিনীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে তার সুনাম। রায়হান পেছন ফিরতে জানে না। সকল ভয় ও বাধা সরিয়ে সে শুধু সামনেই ছুটে চলে। তার হূদয়জুড়ে শুধু জয়ের নেশা।

ডিসেম্বর মাস। বাঙালিদের বিজয় প্রায় নিশ্চিত। মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে একটার পর একটা পাকি লেজ গুটিয়ে ভোঁদৌড়ে পালাচ্ছে বিড়ালের মতো। জেনারেল নিয়াজিও নতশিরে  মিয়াও মিয়াও করছে।

যেকোনো সময় আসতে পারে বিজয়ের সংবাদ। বুঝে গেছে রায়হান। এমন একটা মুহূর্তে, ১৫ ডিসেম্বর রাতে এক সহযোদ্ধার মাধ্যমে রায়হান খবর পেল, তার স্ত্রী দু’দিন আগে যমজ সন্তান জন্ম দিয়েছে। সে ফুটফুটে এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা হয়েছে।

আনন্দে লাফিয়ে উঠল রায়হান। একদিকে বিজয় বিজয় একটা হাওয়া বাংলার আকাশে আকাশে। অন্যদিকে বাবা হওয়ার অপার আনন্দ। পাখির মতো উড়ছে তার মন। কখন সে দেখতে পারবে সন্তানদের সোনামুখ, কখন? একটু বিলম্বও যেন সইছে না।

কমান্ডারের অনুমতি নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটল রায়হান। অনেক দূরের পথ। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো গাড়িতে, কখনো বনজঙ্গল ভেদ করে, নদী সাঁতরিয়ে, অনেক বিপদ মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছে সে। তখনো খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলছে। ঝোপঝাড়ে ওত পেতে আছে রক্তখেকো হায়েনারা। এরকম সময়ে শুধু একটা রাইফেল সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ছুটে চলছে রায়হান।

ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পরদিন ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে নিজগ্রামে পৌঁছাল সে। বাড়ির কাছে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই রাজাকারের দল ঘিরে ফেলল তাকে। গুলি চালাতে লাগল চারদিক থেকে। রায়হানও গুলি চালাতে লাগল বীরের মতো। খতম করে ফেলল কয়েকজনকে। হঠাত্ ওদের একটা গুলি এসে লাগল রায়হানের শরীরে। রায়হান ভীষণভাবে আহত হয়েও সবক’টা রাজাকারকে শেষ করে নিজ বাড়ির উঠোনে এসে পড়ে গেল। গোঙাতে গোঙাতে মাকে ডেকে বলল, আমি এসেছি মা। স্ত্রীকে বলল, রাবেয়া, আমার সন্তানরা কোথায়? ওরা খুব সুন্দর হয়েছে, না?

রায়হানের মা এবং স্ত্রী রাবেয়ার মাথায় সহসা যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে দুজনে দুই সন্তানকে নিয়ে এল রায়হানের কাছে। সে তার রক্তলাল বুকে জড়িয়ে নিল সন্তানদের। চুমু খেল পরম আদরে। তারপর বলল, আমি আমার বাবাটার নাম রাখলাম বিজয়। আর মামণিটার নাম দিলাম মুক্তি। তারপর হাসতে হাসতে বিজয়কে তুলে দিল রাবেয়ার হাতে। মুক্তিকে তুলে দিল মায়ের হাতে। তারপর হঠাত্ দু’চোখ বন্ধ করল রায়হান।

ঠিক তখনই চারদিকে হইচই শোনা গেল। এল বিজয়ের খবর। রায়হানের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, যেন একচিলতে হাসি দু’ ঠোঁটের মাঝখানে ঝলমল করছে।