আমাদের সাহিত্যভুবনে দিলারা মেসবাহ স্বল্পালোচিত হলেও নিজ প্রতিভাগুণে তিনি সমৃদ্ধ সাহিত্যব্যক্তিত্ব। সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তাঁর বিচরণ। ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, কিশোর সাহিত্য, রম্য রচনা এবং ছড়ার ভুবনে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসাধারণ কিছু মণিমাণিক্য।
এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ২৭টি। সত্তর দশকের মধ্যভাগ থেকে তিনি লিখছেন। আমার বিবেচনায় তাঁর সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে সবল শাখাটি হলো—ছোটগল্প।
ছোটগল্পের বিষয় নির্বাচনে তিনি বহু পথের দিশারি। গল্পে গ্রামীণ জনপদ ও জীবনের কথকতা যেমন উঠে এসেছে তেমনি নাগরিক জীবনের চালচিত্রও। গভীর সমস্যা কিংবা ছোট কোনো বিষয় সমান দক্ষতায় বিবৃত করেন গল্পে। গল্পের কাঠামো গড়ে তোলেন পরম নিবিষ্ঠতায়।
দিলারা মেসবাহ’র জন্ম পাবনা শহরে, শৈশব-কৈশোর কেটেছে পাবনা, রাজশাহী ও কুমিল্লায়। স্বামীর সাথে বিভিন্ন শহরে বসবাসের পর স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। সে সময় থেকেই লেখালেখিতে নিয়মিত হয়েছেন। এরও দশ বছর পর তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে বোঝা যায় যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ও সময় দিয়েছেন লেখাকে গ্রন্থবদ্ধ করতে। আরো চার বছর পরে প্রথম গল্পগ্রন্থ পাঠকের হাতে পৌঁছায়। সম্প্রতি তাঁর গল্পসমগ্রও প্রকাশিত হয়েছে।
যেহেতু পঁয়ষট্টিটি গল্প নিয়ে গল্পসমগ্র গ্রন্থটি আমরা পেয়ে গেছি, তাতে ধরে নেওয়া যায়, এই গ্রন্থে তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগুলো সব রয়েছে। এখান থেকে কয়েকটি গল্প পর্যালোচনা করলে ছোটগল্পকার হিসেবে তাঁকে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে বলে ধারণা। গল্পসমগ্র গ্রন্থের প্রথম গল্পটির শিরোনাম—‘সতীপুষ্প ও ময়াল সাপের গল্প’। এক অন্ত্যজ নারীর সাহসিকতার কাহিনি। গল্প-উপন্যাসে চরিত্র উপস্থাপনের যে তিনটি ধারা প্রচলিত তার মধ্যে একটি হচ্ছে—লেখক-চরিত্রের দৃষ্টিকোণ, এই গল্পে লেখক এই ধারাটিই অনুসরণ করেছেন। ‘শাহজাদপুর কল্যাণী শিল্পকেন্দ্র’-এর কর্মী মায়মুনা এ গল্পের প্রধান চরিত্র। হস্তশিল্পের কাজ করে দরিদ্র নারীরা কিছু রোজগার করে। কেন্দ্রের কোঅর্ডিনেটর তাহমিনা কর্মীদের কাজ দেওয়া-নেওয়া করেন। একজন শিক্ষিত কর্মকর্তা কুদ্দুস মোহাম্মদ কাজের মান পরীক্ষা ও আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ করেন। মায়মুনাদের তার সঙ্গে কাজ করতে হয়। স্বল্প রোজগারে স্বামী, কন্যা আর পুত্র নিয়ে মায়মুনার সাধারণ জীবন। লোভহীন জীবনে সে সম্মানকেই সবার ওপরে স্থান দিয়েছে। সেখানেই একদিন নোংরা হাত ছোঁয়ায় কুদ্দুস। মায়মুনা, সাধারণ এক গ্রামীণ নারী, সম্ভ্রম হারানোর শঙ্কায় সহসা অসীম সাহসে বলীয়ান হয়ে কাঁচিকেই অস্ত্র বানিয়ে আঘাতে আহত করে কুদ্দুসকে। অবিবাহিত তাহমিনা মায়মুনার কাছে এই সাহসের উত্স সন্ধান করে। মায়মুনা জানায়, এটি সে পেয়েছে উত্তরাধিকারসূত্রে। নারী অবলা—এই ধারণা ভেঙে দেওয়ার এই গল্পটির নামকরণ ও বয়ান প্রাচীন ধারার। সরল এবং গতিময়। চরিত্রচিত্রণে বাহুল্য নেই।
দ্বিতীয় গল্প—‘মর্মমূলের গীতধ্বনি’। এটিও গ্রামীণ জীবনের গল্প।
প্রতাপধারী আক্কাস মৃধার মেয়ে সোহাগীর বিয়ে। বাড়ি তাই উত্সবের আনন্দে মাতোয়ারা। উঠোনে চালের গুঁড়োর আলপনা, সুতলিতে ঝুলানো রঙিন ত্রিকোনা কাগজ। গায়ে হলুদের উপাচার নিয়ে এসেছে যুবতীরা। তারা কনের দাদিকে ঘিরে হাস্য-কৌতুকে মেতে ওঠে। দাদিও সমান তালে তাদের সঙ্গ দেয়। শীতলপাটির ওপর বসিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করে তিলের নাড়ু, নারকেলের বরফি, বাতাসা, মুড়কি আর আন্দোসা পিঠা দিয়ে। মাষকলাই ডালের লাসা লাসা খিচুড়ি আর গরুর গোশত, তেঁতুলের চাটনি, দই, ইলিশভাজা দিয়ে দুপুরে আপ্যায়ন করা হয়। খাবারের সুগন্ধ সারাবাড়ি ছড়িয়ে থাকে।
এমনই খুঁটিনাটি বর্ণনে একটি গ্রামীণ বিবাহবাড়ির গড়পড়তা আনন্দচিত্রটির সঙ্গে পাঠক যখন একীভূত তখন লেখক এটিকে ভেঙে ফেলেন অপূর্ব দক্ষতায়। মৃধার স্ত্রী মোমেনা কুটুমদের জন্যে রান্নায় ব্যস্ত ছিল। ছেলের কাছে বিপদের খবর শুনে মোমেনা ছুটে যায় দোতলার ঘরে। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বড়ো মেয়েকে পায়ে শিকল বেঁধে আটকে রাখা হয়েছে সেখানে। চায়না মুখের বাঁধন খুলে ফেলেছে। সে বায়না করে—ইলিশভাজা দিয়ে ভাত খাব, মা। আক্কাস মৃধার কড়া নির্দেশ ওকে কিছুতেই বরপক্ষের সামনে যেতে দেওয়া যাবে না। তাতে ছোট মেয়ের বিয়ে ভেঙে যেতে পারে। মোমেনা চোখের জলে অনুনয় করে—তোর পায়ে ধরি মা, তুই চুপ থাক।
চায়না জানতে চায়, মা আমার বিয়া দিবা না?
অবুঝ মেয়ের বায়না সহ্য হয় না। মায়ের হাতের প্রথম চড় খেয়ে চায়না চুপ হয়ে যায়।
মেয়ের অসুস্থতার দায়ে দায়ী মোমেনা এ সমাজের হাজারো নারীর একজন। মুখ বুজে মার খেয়েই চলেছে। এ গল্প পুরাতন হয়নি বিংশ শতকে এসেও।
চমত্কার একটি গল্প ‘খুরপি কাহিনী’। পায়রাবন্দ গ্রামের সাবেদ আলি প্রামানিক ওরফে পোড়াখাটিয়া বেগম রোকেয়ার নাম শোনেনি। শতোর্ধ পোড়াখাটিয়ার হাতে একটা খুরপি। খুরপি হাতে মানুষটি ধবল জ্যোত্স্নায় মাঠে চলে যায় ভুঁই নিড়াতে। কাটারি ভোগ ধান ফলায়।
পোড়াখাটিয়া নামের অত্যাশ্চর্য চরিত্রটি গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনোযোগ টেনে রাখে। একটি মাত্র চরিত্রে কেন্দ্রীভূত কাহিনি প্রায়শই ঝুলে যায়, কিন্তু এ গল্পে ঘটেনি লেখকের গদ্যের গতিশীলতার কারণে। পোড়াখাটিয়া নামটির মতো এর কাহিনিও বেশ চমকপ্রদ।
গ্রামীণ পটভূমির একটি নিপুণ গল্প—‘বিবি দৌলতুননেসার দরদালান’। মীর মঞ্জিল একটি বিশাল দালানের মালিক দৌলতুননেসা। যে দালানবাড়ি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। দৌলতুননেসার নিজের মেয়ে নূরহাসনা ও সতীন পুত্র ঢাকায় বসবাস করে। জীবনের নানা স্মৃতিঘেরা বাড়িতে দৌলতুননেসা একাই বাস করেন। ছেলেমেয়ে বাড়ি ভেঙে ফেলতে চায় আর দৌলতুননেসার ঘোষণা—‘এই দালান থেকে আমার শেষযাত্রা হবে।’ কিন্তু সেটি ঘটে না। অসুস্থ অসহায় দৌলতুননেসার ঠাঁই হয় পরিত্যক্ত অতিথিশালায়। দালান ভেঙে গড়ে তোলা হয়—মীর প্লাজা নামের বহুতল ভবন। সমাজ বিবর্তনের চমত্কার উপস্থাপন। দৃঢ়চেতা দৌলতুননেসার বাহ্যিক কঠোর মানসিকতার পাশাপাশি একটি মমতাময়ী মনের হদিসও পাওয়া যায়। দৌলতুননেসার চরিত্রটি খুব নিপুণতার সাথে গড়ে তুলেছেন লেখক। যার সাথে আমরা মিল খুঁজে পাই আমাদের চারপাশে বিবর্তনের চাপে ন্যুব্জ প্রবীণ প্রবীণাদের। নিরুপায় অসহায়তায় যারা মেনে নিচ্ছেন আধুনিকতা নামের নতুন জীবনব্যবস্থা।
গ্রামীণ পটভূমির এইসব গল্পে লেখক লোকজ ভাষা ব্যবহার করেছেন অনায়াস দক্ষতায়। বিস্ময়টা সেখানেই যে লেখক দিলারা মেসবাহর গ্রামে থাকার অভিজ্ঞতা তেমন নেই। সামান্য কিছু সুযোগ নানা জায়গায় বসবাস করতে গিয়ে আর বাড়ির সাহায্যকারীদের কাছে। সেখান থেকেই থলেয় জমিয়ে রেখেছেন লোকজ শব্দভাণ্ডার। প্রয়োজনে তার সদ্ব্যবহার করেন অনায়াস দক্ষতায়। আর তাতেই গ্রামজীবনের নিখুঁত চিত্র এঁকে উঠতে পারেন তাঁর গল্পে। গ্রামীণ মানুষ, বিশেষ করে অন্ত্যজশ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত অধিকারবঞ্চিত মানুষ উঠে আসে তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে। তাদের চিন্তা-চেতনা, দুঃখ-ভালোবাসার এমন নিবিড় প্রকাশ তাঁর অসাধারণ পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতারও প্রমাণ। তাঁর গল্পের চরিত্রের মুখের ভাষা ব্যবহারে তিনি অকৃত্রিম। কাহিনি বর্ণনে অতীত ধারা অনুসারী।
তেমনি নাগরিক জীবনের গল্প নির্মাণেও তিনি খুব নিবিড় অধ্যবসায়ী। ‘ব্যবচ্ছেদ’ তেমনি একটা গল্প। মধ্যবিত্ত নারী রুম্পার একটি ফিরোজা পাথরের আংটির শখ পূরণের চেষ্টা ও পরিণতি এর আখ্যান। চারপাশে হালকা গোলাপি মুক্তার মাঝখানে ফিরোজা পাথর বসানো আংটির জন্য চার হাজার আট টাকা জমাতে রুম্পার তিন বছর লাগে। আংটি কেনেও। কিন্তু সে আংটি রুম্পার পরা হয় না। খুব সাদামাটা এই কাহিনিই দিলারা মেসবাহ শব্দের জাদুজালে জড়িয়ে একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন সুখপাঠ্য এক গল্পে।
দিলারা মেসবাহ শান্ত এবং চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। ইতিবাচকতা তাঁর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর লেখায় এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। লেখায় নেতিবাচক চিন্তাধারাকে জোরালোভাবে উপস্থিত না করার চেষ্টা করেন তিনি। সবর্ত্রই মমতার একটি হাত অদৃশ্য হলেও অনুভব থাকে। মমতা মানুষের প্রতি। অসহায়, দুর্বল, বঞ্চিতরাই তাঁর গল্পের প্রধান উপাদান।
অল্প বয়সে বিয়ে, সন্তানের জন্ম, যৌথ পরিবারের বিবিধ টানাপোড়েনের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, শহর থেকে শহরান্তে বসবাস, সেই সূত্রে নানা এলাকায় নানা স্তরের মানুষের সান্নিধ্য—এই সব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে অতিবাহিত জীবন-বাস্তবতা দিলারা মেসবাহর লেখনিকে শক্তিশালী করেছে। এজন্যই তাঁর গল্প এত জীবনঘনিষ্ঠ।
