বিশ্বের ধনী দেশগুলো আয়ের উেসর ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত—প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর অর্থনীতির দেশ ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর অর্থনীতির অনেক দেশেই জনগণ জৌলুসপূর্ণ জীবনযাপন করেন। কিন্তু জ্ঞানচর্চার সাধনায় তারা পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জ্ঞাননির্ভর সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলো মেধাকে পুঁজি করেই নিজেদের অর্থনীতিকে সুসংহত করেছে। এশিয়া মহাদেশের এমন একটি দেশ জাপান। দেশটিতে ভারী শিল্প উত্পাদনের প্রধান উপাদান লোহার আকরিক নেই, কিন্তু অন্য দেশ থেকে লোহার আকরিক আমদানি করেই জাপান আজ স্টিল উত্পাদনে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে জ্ঞানার্জনকে ব্রত করে এগিয়ে চলেছে জাপান। জ্ঞানপিপাসু ও পরিশ্রমী জাতি বলে খনিজসম্পদ না থাকা সত্ত্বেও জাপান পৃথিবীতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
চীনের একটি ভাস্কর্যের কথা বলছি। ভাস্কর্যটিতে একটি ব্যালেন্সের এক পাশে হালকা গড়নের একজন তরুণ অনেকগুলো বই সঙ্গে নিয়ে বসে আছে। অন্য পাশে একজন স্থূলকায় ব্যক্তি একটি বই হাতে বসে আছে। ব্যালান্সটি কিন্তু অল্প বয়সি ছেলেটির দিকে হেলে পড়েছে। নিচের ক্যাপশনে লেখা ‘তোমার ওজন কিলোগ্রাম অথবা আকারের ওপর নির্ভর করে না। বরং তা নির্ভর করে তুমি কতগুলো বই পড়েছ তার ওপর।’ আমি মনে করি, চীনারা জাতিগতভাবে এই কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। সেজন্যই হয়তো পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে তারা জ্ঞানভিত্তিক উপনিবেশ তৈরি করেছে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে চীনাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাছাড়া বিশ্ববাজারে শিল্পপণ্যের বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে চীন দেশ।
যে জাতি ব্যক্তির শারীরিক ওজনকে প্রাধান্য না দিয়ে ব্যক্তির পঠিত বই থেকে অর্জিত জ্ঞানের ওজনের দর্শনকে প্রাধান্য দেয়, সে জাতির উন্নয়ন রোহিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। জ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মূল চালিকাশক্তি অঙ্ক। অঙ্ক বিষয়ের বিশ্ব র্যাংকিং তালিকাতেও চীনের অবস্থান এক নম্বরে। এই তালিকাতে বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টি দিলে দেখা যায় শিল্পে উন্নত দেশগুলোর প্রত্যেকটির অঙ্কবিষয়ক দক্ষতায় তালিকার প্রথমে দিকে অবস্থান করছে। এ থেকে বোঝা যায়—গবেষণা, উন্নয়ন ও শিল্প উত্পাদনসংক্রান্ত জ্ঞানের সঙ্গে অঙ্কের নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। বর্তমান যুগের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের মূলে যে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং তাতেও পারদর্শিতা অর্জনে দরকার অঙ্কের নিরঙ্কুশ জ্ঞান। আমার মতে, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং দক্ষতার বিচারে যে দেশগুলো এক থেকে তিনের মধ্যে অবস্থান করছে, তাদের অঙ্ক শেখানোর কৌশল স্কুল-কলেজে গ্রহণ করা উচিত। অন্যথায় চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠা দুষ্কর।
বর্তমান সরকারের সবার জন্য শিক্ষানীতি বাস্তবিক অর্থে প্রশংসার দাবি রাখে। জনসংখ্যার অনুপাতে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ একেবারেই সীমিত। তাই জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার বিকল্প পথ আছে বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু যে কোনোভাবে পরিশ্রম করে গেলেই সফলতা আসবে না এটা অবধারিত। পরিশ্রম করতে হবে সঠিক উপায়ে, সঠিক পদ্ধতিতে ও সঠিক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে। অনেকেই অজুহাত দেন, দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কেউ নেই। কিন্তু আমরা কি জানি, বই জীবনের অন্যতম সেরা দিকনির্দেশক। জীবনকে বদলে দেওয়ার মতো সঠিক দিকনির্দেশনাগুলো লেখা থাকে বইয়ে। একবার ভাবুন তো, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠনকারী অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, ভোগবিলাসে মত্ত ব্যক্তি কি কখনো বই লিখেছেন? এটা হলফ করে বলা যায়, নেতিবাচক চিন্তার ভোগবাদী মানুষের পক্ষে বই লেখা সম্ভব নয়। বই লেখেন শুদ্ধ ও গভীর চিন্তাসম্পন্ন সমাজের সুশীল ও শুভ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি। পৃথিবী যারা গড়েছেন, জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন যারা ঘটিয়েছেন, তারা কেউ কিন্তু সাধারণ মানুষ নন। তাদের জীবনোপলব্ধি, জীবনকালের অভিজ্ঞতা, কর্মপন্থা ও জীবনদর্শনই কালো অক্ষরে উপস্থাপিত হয় আমাদের সামনে বই আকারে। তাই বইপড়া মানে সত্যিকার অর্থে ঐ গুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা। বই পড়তে গিয়ে কখনো ভাববেন না আপনি পড়ছেন, ভাবুন কালো অক্ষরের জাদুতে কোনো অসাধারণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছেন বা গল্প করছেন। দেখবেন পড়তে গিয়ে কষ্ট হচ্ছে না বরং আনন্দ পাচ্ছেন। বই বিমুখী জাতি কখনই উন্নয়নের সঠিক পথ খুঁজে পায় না। জাতি যত বেশি বইবিমুখী হবে তত বেশি ভোগবিলাসে মত্ত মোটা বুদ্ধির জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে।
আমাদের দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষা কোচিংনির্ভর হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা নিজেরা কিছু করতে চায় না। গাইড অথবা শিক্ষকের টিউশনি থেকে পড়ার মূল অংশগুলো পেতে চায়। সৃজনশীল প্রশ্নের প্রাবল্যে সৃজনশীলতা হারিয়ে ছাত্র-শিক্ষক উভয়েরই মূল বই গৌণ হয়ে গাইড বইটি মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটা কলেবরের বই পড়তে গিয়ে যদি শিক্ষার্থীদের গাইড বই না লাগে তাহলে স্কুল-কলেজে কেন মূল বইটি যথেষ্ট হচ্ছে না—এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরিতে বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে, যা একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে উন্নত ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সর্বাগ্রে বিজ্ঞানের ভিত্তি শিক্ষার কথা ভাবতে হবে। সুপ্রিয় পাঠক, ভাবুন তো, পৃথিবীর এমন কোনো আবিষ্কার বা প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটেছে কি, যা অঙ্ক, রসায়ন বা পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। নিজ সন্তান মাধ্যমিক স্তরে অধ্যয়ন করায় বইগুলোকে নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ হয়েছিল। মাধ্যমিক শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান বইটিকে দেখলে ভীষণভাবে হোঁচট খেতে হয়। স্কুল-কলেজের বই রচনায় এমনভাবে এগোতে হবে, যেন বিজ্ঞানের ভিত্তি শিক্ষাগুলো শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে। তবেই তারা প্রত্যয়ী ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় পুনঃপুন অনুশীলনের দৃষ্টিভঙ্গি তিরোহিত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুল-কলেজের সৃজনশীল প্রশ্নের ‘গ’ ও ‘ঘ’ অংশের উত্তর আমাদেরকে সৃজনশীল না করে অপ্রত্যয়ী নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছে। ‘গ’ ও ‘ঘ’ অংশে একই কথা ঘুরিয়েফিরিয়ে লিখলে পরীক্ষক নম্বর দিয়ে দেন। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্ভুল ও সঠিকভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তাছাড়া অঙ্কের ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজে আমরা শিখি, কীভাবে অঙ্কটি করতে হবে। কিন্তু অঙ্কটির প্রয়োগের ক্ষেত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেওয়া হয় না। তাছাড়া সমাধানের পদ্ধতিগত জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে কেন পদ্ধতিটি অনুসরণ করছি, তা জানাতে পারলে অঙ্ক শেখা ভীতিকর না হয়ে আনন্দদায়ক হবে বলে আমি মনে করি। তাই প্রাকৃতিক সম্পদস্বল্পতার এই দেশে, জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে মননে ও কর্মে ধারণ করতে হবে জ্ঞানচর্চার সাধনার দর্শন।
n লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যলয়, গাজীপুর
