সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ জহুর হোসেন চৌধুরী

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৩

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ সংবাদপত্র জগতের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব জহুর হোসেন চৌধুরীর ৪০তম প্রয়াণবার্ষিকী আজ। ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ঢাকার তত্কালীন পিজি হাসপাতালে তার কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। ২৩ বছর বয়সে ১৯৪৫ সালে সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবনের শুরু। ১৯৮০ সালের নভেম্বরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত তার সাংবাদিকতা অব্যাহত ছিল। অসুস্থ শরীরেও তিনি একটানা প্রায় পাঁচ বছর লিখে গেছেন তার জনপ্রিয় কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’।

জহুর হোসেন চৌধুরীর জন্ম ১৯২২ সালের ২৭ জুন বর্তমান ফেনি জেলার দাগনভুঁইয়া উপজেলার রামনগর গ্রামে। তার পিতা সাদাত হোসেন চৌধুরী ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কর্মস্থল ছিল সিরাজগঞ্জ। সেখানেই এক উচ্চবিদ্যালয়ে জহুর হোসেন চৌধুরী শিক্ষাগ্রহণ করেন ও ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৪০ সালে আইএ ও ১৯৪২ সালে ইতিহাসে অনার্সসহ বিএ পাশ করেন।

জহুর হোসেন চৌধুরীর সাংবাদিক জীবনের সূচনা হয় হাবীবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত ‘বুলবুল’ পত্রিকায় ১৯৪৫ সালে। এরপর তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেটসম্যান’, ‘কমরেড’, ও ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং কিছুকাল সরকারি চাকরি করেন। পরে আবার তিনি সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন এবং ‘উপাত্ত’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা এবং ইংরেজি দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন। ১৯৫১ সালে দৈনিক ‘সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা শুরু হওয়ার পর বংশাল রোডে ‘সংবাদ’ কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পত্রিকার প্রকাশনা ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আজীবন ‘সংবাদ’-এর অন্যতম পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ‘সংবাদ’ এর সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি নেন এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ‘কাউন্টার পয়েন্ট’ নামে একটি ইংরেজি সাময়িকীর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে তিনি ‘সংবাদ’-এ তার বিখ্যাত কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’ লিখতে শুরু করেন। কলামটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, যার ফলে পাঠকদের কাছে পত্রিকার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। প্রথমদিকে কলামটি সপ্তাহে একবার প্রকাশিত হতো, পরে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে জহুর হোসেন চৌধুরী সপ্তাহে দুই দিন কলামটি লিখতেন এবং শেষ পর্যন্ত তাই লিখে গেছেন। এই কলামে তিনি জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন। তার সংবাদ বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও মন্তব্য পাঠকদের মুগ্ধ করত। তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে যে কোনো বিষয়ে তার বক্তব্য ও মন্তব্য প্রকাশ করতেন। এর মূল্যও তাকে দিতে হয়েছিল। মৃত্যুর বছরখানেক আগে তার কোনো একটি নিবন্ধের কারণে তত্কালীন সরকার অসন্তুষ্ট হন এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়। রমনা থানার পুলিশ রাত ১২টায় তাকে ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করে থানায় এনে বসিয়ে রাখে এবং পরদিন সকালে মুক্তি দেওয়া হয়। অসুস্থ জহুর হোসেন চৌধুরী এই ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন এবং তার স্বাস্থ্যের আরো অবনতি হয়।

জহুর হোসেন চৌধুরী ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১—প্রায় ১৭ বছর সংবাদের সম্পাদক ছিলেন। এই সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের খবর পত্রিকার পাতায় গুরুত্বসহকারে ছাপা হতো। সে কারণে পত্রিকাটি রাজনৈতিক মহলে ও জনগণের কাছে প্রিয় ছিল। ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পুরোটাই সংবাদের প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল। খবরটির শিরোনাম ছিল, ‘এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এই শিরোনাম আর কোনো পত্রিকা দেয়নি। এই সাহসী শিরোনাম সাহসী সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীর কারণেই সম্ভব হয়েছিল। সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ জহুর হোসেন চৌধুরী অবিস্মরণীয়।

n লেখক :সাংবাদিক