আইন নিয়ে আতঙ্ক, জাহাজ ছাড়ছেন ক্যাপ্টেন-ক্রুরা

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৪৫

নতুন সামুদ্রিক মত্স্য আইনের কিছু ধারা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন দেশের গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণে নিয়োজিত ফিশিং ট্রলারের মালিক, ক্যাপ্টেন এবং ক্রুরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সর্বপ্রথম প্রণীত এই আইনে অনেকগুলো ধারা ফৌজদারি শাস্তির আওতায় আসায় এই আতঙ্ক আরো গভীর হয়েছে। আইনের প্রায় ১০ থেকে ১২টি ধারা-উপধারা গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের ক্ষেত্রে জাহাজ মালিক এবং ক্যাপ্টেন-ক্রুদের গভীরভাবে বিচলিত করছে বলে তারা জানান। তাদের মতে আইনের এসব ধারা-উপধারা গভীর সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলারের মালিক, ক্যাপ্টেন-ক্রুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। কাজেই দেশের অর্থনীতি ও গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের ক্ষেত্রে শঙ্কামুক্ত পরিবেশ তৈরির জন্য এগুলো সংশোধন প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

এদিকে এই আইনের কারণে ভীত হয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ করে ক্যাপ্টেন-ক্রুদের সবাই জেটিঘাটে ফিরে আসছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। উদ্ভূত সংকট নিরসনে নতুন সামুদ্রিক মত্স্য আইন-২০২০-এর কিছু ধারা-উপধারা সংশোধনের জন্য অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, অবৈধ মত্স্য আহরণ নিয়ন্ত্রণে ১২ নম্বর ধারার ১ ও ২ উপধারা সংশোধন, লাইসেন্স স্থগিত বিষয়ে ১৩ নম্বর ধারার ২ (১) উপধারা সংশোধন, ১৬ নম্বর ধারার ২ উপধারায় উল্লেখিত স্ট্যান্ডিং শিট পদ্ধতি বাস্তবসম্মত নয় বিধায় এই পদ্ধতি বিলুপ্ত করা, ১৬ নম্বর ধারার ৩ উপধারাটি ত্রুটিপূর্ণ বিধায় সেটি বিলুপ্ত করা, ১৬ নম্বর ধারার ৯ উপধারায় মাছের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বিধায় ২ লাখ টাকা প্রশাসনিক জরিমানা আরোপ করা, নিষিদ্ধ জাল-সরঞ্জামের বেলায় ২৮ নম্বর        ধারায় ২ বছরের কারাদণ্ড, ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড রহিত করে ৫ লাখ টাকা প্রশাসনিক জরিমানা আরোপ, ৩২ নম্বর ধারায় অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘোষণা, মত্স্য নৌযানের গতিরোধ, পরীক্ষা ইত্যাদির ক্ষেত্রে ৫৩ নম্বর ধারায় ২ বছরের কারাদণ্ড ও অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড রহিত করে ৫ লাখ টাকা প্রশাসনিক জরিমানা নির্ধারণ, বেআইনিভাবে মাছ ধরা, সংরক্ষণ, মজুত ও বিক্রির ক্ষেত্রে ৫১ নম্বর ধারার ২ বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা কমিয়ে ৫ লাখ টাকা করা ইত্যাদি।

বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নুরুল কাইউম খান ইত্তেফাককে বলেন, জাতীয় সংসদে পাশ করা সামুদ্রিক মত্স্য আইন-২০২০ ব্যবসায়ীবান্ধব নয়, জনবান্ধবও নয়। ইতিমধ্যে এই আইনের যেসব ধারা-উপধারা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তা সংশোধনের অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে ফ্যাক্সমাধ্যমে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমরা আশা করছি তার কাছ থেকে শিগিগরই একটি সুবিবেচনা পাওয়া যাবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, নতুন সামুদ্রিক মত্স্য আইনে এমন সব বিষয় যুক্ত করা হয়েছে যা আন্তর্জাতিক কোনো আইনের সঙ্গে যায় না। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য তার কাছ থেকে অ্যাপোয়েন্টমেন্টও চাওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন এই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রে মত্স্য আহরণে নিয়োজিত স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা পর্যন্ত করা হয়নি। এই আইনে যাকে তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে গভীর সমুদ্রগামী মাছ ধরার ট্রলারের ক্যাপ্টেন, ক্রু, স্কিপার, সেইলার সবাই আতঙ্কিত হয়ে গত ৬ ডিসেম্বর থেকে সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ করে জেটিতে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। ক্যাপ্টেনরা বলছেন, ১০/১২টি ধারা-উপধারা সংশোধন করা না হলে তারা আর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাবেন না। ক্রুরাও একই কথা বলছেন। এই পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ আর্থিক বিনিয়োগে আটকাপড়া মালিকরা তাদের বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনার ক্ষেত্রে গভীর সংকটে পড়েছেন।

অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, বর্তমান আইন অনুসারে জরুরি কারণে জেটিতে ফেরত আসা জাহাজকে পুনরায় সমুদ্রে যাওয়ার জন্য আবার ২১ দিন অপেক্ষা করে বসে থাকতে হবে। সেই সঙ্গে জাহাজের বৈধ মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বর্তমান আইনে সৃষ্টি করা হয়েছে গভীর জটিলতা। বর্তমানে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসাবে ১৩৪টি এধরনের ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণে নিয়োজিত আছে বলে তিনি জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদে এই প্রথমবারের মতো সামুদ্রিক মত্স্য আইন-২০২০ পাশ হয়েছে। গত নভেম্বর মাসে এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে সমুদ্রে মাছ শিকারের ব্যাপারে কোনো আইন বা নীতিমালা ছিল না। এদিকে নতুন সামুদ্রিক মত্স্য আইন সংশোধনের দাবিতে গত ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামে একটি সংবাদ সম্মেলন করে। এছাড়া এই আইনকে বাস্তবধর্মী করার আহ্বান জানিয়ে মেরিন হোয়াইট ফিশ ট্রলার অ্যাসোসিয়েশনও সংবাদ সম্মেলন করেছে।