প্রদীপের নিচে অন্ধকার অংশটিও চিন্তার কারণ

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:১৯

একটি ঠিকঠাক ভ্যাকসিন পাইতে মুখাইয়া ছিল সারা বিশ্ব। একাধিক কার্যকরী টিকা পাওয়া গিয়াছে অবশেষে। কিন্তু করোনার টিকা পাওয়া গিয়াছে মানে এই নহে যে, বিপদ দূর হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। সমস্যাটা আসলে বহুমুখী। টিকার যেমন বিশাল বাজার অর্থনীতি এবং রাজনীতি আছে, তেমনি টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের অনীহাও আছে। সেই অনীহার চিত্রটি কিন্তু মারাত্মক। গুটিবসন্তের মতো মারণরোগকে যেমন টিকার মাধ্যমে বিশ্ব হইতে নির্মূল করা সম্ভব হইয়াছিল, তেমনি পোলিও রোগটিও টিকাকরণের মাধ্যমে নির্মূল করিবার দ্বারপ্রান্তে ছিল বিশ্ব। কিন্তু পোলিও টিকাকরণে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই নেতিবাচক প্রচারণা রহিয়াছে এবং টিকার কর্মীরা বাধার মুখে পড়িয়াছেন। মজার ব্যাপার হইল একটি বিখ্যাত সংবাদ সংস্থার করা জরিপে দেখা গিয়াছে, বিশ্বের সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ আমেরিকাতেও কোভিডের টিকা লইতে আগ্রহ দেখাইয়াছেন মাত্র ৪৭ শতাংশ মানুষ। বাকিরা ধন্দে রহিয়াছেন। যে  কোনো রোগের টিকার ব্যাপারে অনেকের অনীহা থাকে। তবে কোভিডের ক্ষেত্রে সন্দেহটা অধিক, তাহার কারণ—ইহা সবচাইতে অল্প সময়ের মধ্যে গণপ্রয়োগের অনুমতি পাইয়াছে। এই কারণে হু-এর মতে, বিশ্বস্বাস্থ্যের প্রথম ১০টি বিপদের মধ্যে ৮ নম্বরে রহিয়াছে টিকা লইবার অনীহা।

আসলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশ হইতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর চিন্তায় ফেলিয়াছে বহু মানুষকেই। যেমন, মাসকয়েক আগে ব্রিটেনে অক্সফোর্ডের টিকার ট্রায়ালে এক অংশগ্রহণকারীর স্নায়বিক সমস্যা ধরা পড়ে। এই দিকে কিছুদিন পূর্বে কোভ্যাক্সিনের ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ভারতের হরিয়ানার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর করোনা ধরা পড়ে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনা অস্বাভাবিক নহে। কারণ, দৈবচয়নে এবং গোপনীয়তার সহিত ট্রায়ালে অংশ নেওয়া অর্ধেক মানুষকে সত্যিকারের ভ্যাকসিন দেওয়া হয় আর বাকি অর্ধেককে দেওয়া হয় ডিস্টিল ওয়াটার। সুতরাং হরিয়ানার ঐ ব্যক্তি করোনা টিকা পাইয়াছিলেন কি না, তাহা কিন্তু জানা যায় নাই। তাহার উপর দুইটি ডোজ পাইবার আগেই সংক্রমিত হইয়াছেন তিনি। তাহা ছাড়া, প্রায় কোনো টিকাতেই কখনোই শতভাগ সুরক্ষা পাওয়া যায় না। টিকার মূলগত দিক হইতে বিজ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন, যে কোনো টিকার ক্ষেত্রেই বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে ধর্তব্যের মধ্যে রাখা হয় না। এই ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখিতে হইবে, বিভিন্ন রোগের টিকাকরণের মাধ্যমে প্রতি বত্সর সারা বিশ্বে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়। তবে প্রদীপের নিচে আরো বড় অন্ধকার হইল—টিকা লইয়া রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির একটি জরিপ বলিতেছে, অগ্রিম ভ্যাকসিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে ধনী ও গরিব দেশসমূহের মধ্যে প্রবল বৈষম্য দেখা দিতেছে। যেইখানে ধনী দেশসমূহ নিজেদের জনসংখ্যার চাইতে কয়েক গুণ বেশি ভ্যাকসিন ক্রয় করিতেছে, সেইখানে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ তাহার জনসংখ্যার ১ শতাংশ ভ্যাকসিনও পাইতেছে না। টিকার বাজার অর্থনীতিও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। কোভিডের কোনো টিকাই পেটেন্ট ফ্রি নহে। বাণিজ্য এখন বিশ্বের সবচাইতে বড় নিয়ামক। এমনকি তাহা রোগব্যাধি লইয়াও। এই প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করিতে পারি জোনাস সাল্কের কথা। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জোনাস সাল্ক আবিষ্কার করেন পোলিওর টিকা। সাল্ককে যখন জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল—তাহার টিকার মালিক কে? উত্তরে সাল্ক বলিয়াছিলেন, তাহার টিকার মালিক বিশ্বের সকল জনগণ। অর্থাত্, উহার কোনো পেটেন্ট নাই। তিনি বলিয়াছিলেন, সূর্যের কি পেটেন্ট নেওয়া সম্ভব? কয়েক বত্সর পূর্বে ফোর্বস ম্যাগাজিনের করা একটি হিসাব হইতে জানা যায়, পোলিওর টিকার পেটেন্ট লইলে সাল্ক প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করিতে পারিতেন!

তবে টিকা এখন নির্দিষ্ট কোনো বিজ্ঞানী সাধারণত আবিষ্কার করেন না। এখন টিকার গবেষণা করা হয় বড় কোনো কোম্পানির বেতনভুক্ত বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে। সুতরাং টিকার রাজনীতি, অর্থনীতি, উত্পাদন, সংরক্ষণ, টিকাকরণের পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ—সকল কিছু মিলাইয়া ২০২১ হইতে যাইতেছে কোভিডের টিকার এক জটিল মহাযজ্ঞ। এই দিকে আমাদেরও শ্যেনদৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।