বিদ্যালয় এবং ছাত্রজীবন—এই শব্দযুগলের মধ্যে রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ততার সম্পর্ক। শুধু শিক্ষাগতই নয় বরং চারিত্রিক দিক গড়ে দিতে বিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। একজন ছাত্রকে তার দায়িত্ব বোঝাতে বিদ্যালয় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বিদ্যালয় প্রদত্ত সেই শিক্ষা একজন ছাত্র এখন বাস্তবজীবনে কতটা কাজে লাগাতে পারছে বা লাগানোর সুযোগ পাচ্ছে?
একটা সময় দেখা যেত ছাত্ররা মাধ্যমিকে পড়ার সময় যতটা পরিপক্বই হোক না কেন, শিক্ষকদের কাছে তারা ছিল সন্তানতুল্য। শিক্ষকদের যে কোনো আদেশ-উপদেশ মাথা পেতে নিত। শিক্ষকরাও তাদের কাছে ছিলেন পিতৃ-মাতৃতুল্য। কিন্তু সেই সোনালি সময়গুলো যেন ফুরিয়ে গেছে, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যকার এই মধুর সম্পর্কে ছেদ ঘটেছে। এই দূরত্বের কারণগুলোর ব্যবচ্ছেদ করলে যে ফলাফল পাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে বিদ্যালয়ে রাজনীতির প্রবেশ। আমার আলোচনার বিষয়বস্তুও ছাত্ররাজনীতি।
ছাত্ররাজনীতির একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে—এর মাধ্যমে নেতৃত্বগুণ বিকশিত হয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি প্রবেশের নেতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে শুধু যে লেখাপড়ার বিঘ্ন ঘটছে তা নয়, বরং একই বিদ্যালয়ে গ্রুপিং, রাজনৈতিক মতবিরোধ ক্যাম্পাসকে করে তোলে অস্থিতিশীল। এক্ষেত্রে ‘আগুনের উপর ঘি’ ঢালার কাজ করে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা। তারা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে ছাত্রদের নিয়ে গড়ে তোলে নিজস্ব গ্যাং, নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী। এসব কিশোর বয়সী ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতেও পিছপা হয় না| বিনিময়ে ছাত্ররা পেয়ে যায় ‘যা ইচ্ছা করার ক্ষমতা’।
বয়ঃসন্ধিকালের অস্থিরতা চলাকালীন এই বয়সে অভাবনীয় ক্ষমতা পেয়ে এই কিশোরদের মাঝে এক ধরনের আত্মাশ্লাঘা কাজ করে। তারা শুধু যে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাই নয় বরং ধ্বংস করে নিজেদের অমূল্য মেধাকে। ‘বড়ভাই’ পরিচয় দেওয়া এই তথাকথিত নেতাদের ছত্রছায়ায় ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধমূলক কাজে। এই তো গেল নোংরা রাজনীতির বিদ্যালয় বহির্ভূত অন্ধকার দিক। ‘বড়ভাই’দের দেওয়া ক্ষমতা পেয়ে ছাত্ররা বিদ্যালয়েও আধিপত্য বিস্তারে তত্পর হয়। যার শুরুটা হয় শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের মধ্য দিয়ে। মতের অমিল হলেই শিক্ষকদের হুমকি-ধামকি, পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বনে উদ্যত ছাত্রকে বাধা দিলে শিক্ষকদের ভীতিপ্রদর্শন এমনকি শিক্ষকদের মারধর করার নজিরও কম নয়। তাছাড়া এসব ছাত্রের নৈতিক অবনমনের আরেকটি দিক মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা। প্রেমে প্রস্তাব, রাজি না হলে শারীরিক হেনস্তা, রাস্তাঘাটে লাঞ্ছিত করা, এমনকি কেউ প্রতিবাদ করতে এলে তাকে মারধর করা—এসব এখন নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। এছাড়া ছাত্রদের নিজেদের মধ্যে মারামারি, হানাহানির ঘটনা তো বলাই বাহুল্য।
সর্বোপরি, নৈতিকভাবে স্খলিত এবং উগ্র মনমানসিকতার এই ছাত্রদের কাছ থেকে কী আশা করতে পারে রাষ্ট্র? অদূর ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে, সমাজে সর্বোপরি অধঃপতন রোধে এখনই সময় এই অরাজকতার লাগাম টেনে ধরার। শিক্ষাক্ষেত্রের এই দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতিকার হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন বেশকিছু উদ্যোগ। সর্বপ্রথম আইনের সংস্কার এবং তার সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা আবশ্যক। আইনের বেড়াজালে আটকাতে হবে আড়ালের সেই খলনায়কদের, যাদের ফাঁদে পড়ে নিজেদের অমিয় সম্ভাবনা নষ্ট করছে অসংখ্য মেধাবী ছাত্র। অপরাধীদের বিচার নিশ্চিতকরণ যেমন জরুরি তেমন জরুরি অপরাধীদের প্রশ্রয়দাতা এবং মদদদাতা তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা দমন। অধিকন্তু রাজনীতিতে প্রবেশের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা, ইতিবাচক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ছাত্রদের কাছে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
