মাদক ব্যবসায়ীর বাড়িতে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র!

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:২২

নেই ডাক্তার, মাদকাসক্ত সাবেক রোগীদের ওপর চিকিত্সার ভার

g হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বড় সাইনবোর্ড। ঠিকানা ধরে যেতে সামনে পড়ে কয়েকটি জুট গোডাউন। সরু পথের শেষ দিকে ছোট ছোট পাঁচ-ছয়টি টিনের ঘর। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এটাই মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ‘দীপ্তি’। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রণীত বিধিমালায় একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তার কোনোটাই এখানে নেই।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিহূিত মাদক ব্যবসায়ী সেলিম মিয়ার ভাড়াবাড়িতে পরিচালিত হতো ‘দীপ্তি’। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর দীপ্তির পেছনের বালুর মাঠে বসে সেলিম মিয়ার মাদকের আড্ডা। সেলিম মিয়ার সঙ্গে বেশ সখ্য দেখা যায় দীপ্তির পরিচালক মো. শফিউল আজম খোকনের। দীপ্তিতে কোনো মনোরোগ চিকিত্সক নেই। নেই সাধারণ চিকিত্সক কিংবা ওষুধও। পরিদর্শন নেই, তদারকিও নেই। মাদকাসক্ত সাবেক রোগীদের দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে দীপ্তি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রটি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নেন আলম খান লেনের মৃত মো. শাহাবুদ্দিন আলমের ছেলে মো. মাকসুদুর রহমান। তখন থেকে জালকুড়ির খেঁজুরতলা এলাকার রাস্তার পাশের একটি টিনশেড বাড়ি ভাড়া নিয়ে কেন্দ্রটি পরিচালিত হচ্ছিল। ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই মাকসুদুর রহমান মো. শফিউল আজম খোকনের কাছে মালিকানা হস্তান্তর করেন। দীপ্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মো. নূরুল কিবরিয়া রনি জানান, সেলিম মিয়ার দুই ভাই মাদক ব্যবসায়ী। আগে কখনোই তারা ঐ এলাকায় আসতেন না। দীপ্তির মালিকানা খোকন পাওয়ার পর সেলিম মিয়ারা ঐ এলাকায় জুট গোটাউন করে ব্যবসা শুরু করেন। এরপর সেলিম মিয়াদের বাড়িতেই এখন দীপ্তির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

গত ৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে এই দীপ্তি থেকেই এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে ‘মাথা ন্যাড়া ও হাত-পা বাঁধা’ অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া ব্যাংক কর্মকর্তা শাহাদাত্ হোসেন ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের লক্ষ্মীনগর এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে। তিনি অগ্রণী ব্যাংক নারায়ণগঞ্জ টানবাজার শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। তার স্ত্রী রওশন আরা সাউথইস্ট ব্যাংকের হেড অফিসের এক্সিকিউটিভ অফিসার। তারা স্বামী-স্ত্রী দুই শিশুপুত্র নিয়ে শহরের ডন চেম্বার এলাকায় আলোর বাড়ির পঞ্চম তলায় ভাড়া থাকেন।

শাহাদাত্ হোসেন বলেন, ‘কয়েক জন মাইক্রোবাসে উঠিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় দীপ্তি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে। প্রথমে আমার মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এরপর আমার সম্পদ ও ব্যাংকে কত টাকা আছে জানতে চায় তারা। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দেরি হওয়ায় লাঠি দিয়ে হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেধড়ক পেটাতে থাকে। এভাবে রাতভর নির্যাতন করে।’ পুলিশ ফতুল্লায় ব্যাংক কর্মকর্তাকে অপহরণ করে নির্যাতন করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দীপ্তি মাদকাসক্তি চিকিত্সা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক মো. শফিউল আজম খোকনকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। এর আগে গত রবিবার রাতে অপহূত ব্যাংক কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বাবুর বড় ভাই জামাল হোসেন বাদী হয়ে সাত জনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।

থানার ওসি আসলাম হোসেন জানান, তুলি বেগমের সঙ্গে বিয়ের পর থেকে পারিবারিক ও সাংসারিক বিষয় নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। এ কারণে শাহাদাত্ হোসেন বাবু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে রওশন আরা তুলি বেগম সুচিকিত্সার জন্য দীপ্তিতে গেলে তারা শাহাদাত্ হোসেনকে মাদকাসক্ত চিহ্নিত করে চিকিত্সার দায়িত্ব নেয়। এরপর তাকে কলেজ রোড থেকে মাইক্রোতে উঠিয়ে দীপ্তি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যায়। পরে তার পরিবারের পক্ষ থেকে ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ গিয়ে মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে শাহাদাত্ হোসেন বাবুকে উদ্ধার করে।

ব্যাংক কর্মকর্তা রওশন আরা তুলি বেগম বলেন, ‘স্বামীর বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। শফিউল আজম খোকন প্রতারণা করেছেন। আমার স্বামী মাদকাসক্ত নয়। তিনি চিকিত্সা না দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে একজন জানান, সহকারী পরিচালক অসুস্থ। তিনিই এ বিষয়ে তথ্য দিতে পারবেন।