অগ্নিকাণ্ড আর পুরান ঢাকা যেন দিনে দিনে সমার্থক হইয়া উঠিতেছে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুরান ঢাকার আকাশ-বাতাস ভারী হইয়া যায়, আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি হতাহতের ঘটনা ঘটে, তাহার পরও টনক নড়ে না সংশ্লিষ্টদের। আজ হইতে ১০ বত্সর পূর্বে পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং সেই ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারাইয়াছে শতাধিক মানুষ। সেই মৃত্যুর মিছিলের চিহ্ন না মুছিতেই গত বত্সর চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ড কাড়িয়া লয় অর্ধশতাধিক প্রাণ। ইহা ছাড়াও গত কয়েক বত্সরে বারবার পুড়িয়াছে পুরান ঢাকার বিভিন্ন ভবন, কারখানা আর গুদাম। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার হইয়াছে চকবাজারের উর্দু রোডের একটি ভবন, যেইখানে ৩০ হইতে ৩৫টি প্লাস্টিক কারখানা ও গুদামের মালামাল পুড়িয়া ছাই হইয়া গিয়াছে। প্রশ্ন হইতেছে, পুরান ঢাকা বারবার আগুনে পুড়িলেও কেন থামানো যাইতেছে না এই দাবানল?
পুরান ঢাকা রাজধানীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এই এলাকাকে কেন্দ্র করিয়া বিভিন্ন সময়ে গড়িয়া উঠিয়াছে শত শত প্লাস্টিক, কেমিক্যাল, প্রসাধনী, পলিথিনসহ বিভিন্ন কারখানা আর গুদাম। এই সকল কারখানা আর গুদামগুলিতেই বেশির ভাগ সময়ে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। বিভিন্ন রিপোর্ট হইতে জানা যায়, এই সব কারখানা ও গুদামের অধিকাংশই অবৈধ, এই গুলির লাইসেন্স দূরে থাকুক, ন্যূনতম ছাড়পত্রও থাকে না। তাহার উপর রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলিতে নিরাপত্তার জন্য অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না। সেই কারণে সামান্য বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটেও দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ। কখনো কখনো এই আগুনের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র হইয়া উঠে যে, ফায়ার সার্ভিসকেও আগুন নিভাইতে বেগ পাইতে হয়। ফলে মৃত্যুর মিছিল বাড়ে, জানমালের ক্ষতিতে অসহায় হইয়া পড়ে এই এলাকার মানুষ। পুরান ঢাকার সচেতন মহল বারংবার রাসায়নিক এবং দাহ্য পদার্থের গুদাম, কারখানা সরাইবার আবেদন জানাইলেও তাহাতে অবস্থার কোনোরূপ পরিবর্তন হয় নাই। নিমতলীর ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর সরকারের পক্ষ হইতে পুরান ঢাকার আট শতাধিক গুদাম ও কারখানা কেরানীগঞ্জে সরাইয়া নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করিবার পরও তাহা বাস্তবায়িত হয় নাই। চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পরও সিটি করপোরেশনের পক্ষ হইতে উদ্যোগ লওয়া হয় আবাসিক এলাকার প্লাস্টিক আর কেমিক্যাল কারখানা সরাইবার। কিন্তু দিন কয়েক পরে সেই তত্পরতা বন্ধ হইয়া যায়। পত্রিকার রিপোর্টে জানা যায়, বেশির ভাগ রাসায়নিক কারখানা এবং গুদামগুলির লাইসেন্স ও অনুমতি নাই। গুটিকয়েক কারখানার লাইসেন্স থাকিলেও তাহাতে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য নিরাপত্তাগত শর্ত পূরণ করা হয় না। স্থানীয় বাসিন্দারা বরাবরই অভিযোগ করিয়া আসিতেছেন, রাসায়নিক কারখানার মালিকেরা প্রভাবশালীদের আনুকূল্যে পার পাইয়া যান। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ইতিপূর্বে বহু ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করিলেও মালিকদের টনক নড়িতেছে না। চকবাজারের উর্দু রোডের আলোচ্য ভবনটিতে ইহার আগে চারবার অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়াছে। নিরাপত্তা ঝুঁকিকে অবজ্ঞা করিবার খেসারত দিতে হয় বারবার ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি দ্বারা।
আমরা দেখিয়াছি, কেবল অগ্নিকাণ্ডের পরপরই পুরান ঢাকার অবৈধ রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরাইবার কথা উঠে। প্রশ্ন হইল, শুধু দুর্ঘটনা ঘটিলেই কেন এই সকল উদ্যোগের কথা উঠিবে? বারবার অগ্নিদুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হইলেও সংশ্লিষ্টরা কেন স্থায়ী সমাধানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছেন না? যেই সকল লাইসেন্সবিহীন অবৈধ রাসায়নিক কারখানা ও গুদামের মালিকেরা বত্সরের পর বত্সর প্রভাবশালীদের আনুকূল্যে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করিয়া আসিতেছেন, তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না কেন? আগুনের লেলিহান শিখা আর কত প্রাণ কাড়িয়া লইলে সকলের ঘুম ভাঙিবে? আমরা আশা রাখি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে স্থায়ী সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন।
