লাইসেন্স অনুমোদন ও নবায়নে পদে পদে হয়রানির অভিযোগ

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৪৪

এলপিজি মজুতে নতুন নীতিমালা, সিলিন্ডার উত্পাদনে ভ্যাট আরোপ এবং লাইসেন্স অনুমোদন ও নবায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। তাদের অভিযোগ, এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও নীতিমালার কারণে বিপাকে পড়েছেন। আঞ্চলিক কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স অনুমোদন ও নবায়ন করতে হয় রাজধানী ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে। যে কারণে অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াও পদে পদে তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। নতুন করে এলপিজি গ্যাস অপারেশনাল ও লাইসেন্সিং ২০১৭ নীতিমালায় বাস্তবতাবিবর্জিত শর্ত জুড়ে দেওয়ায় অধিকাংশ এলপিজি বাজারজাত প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, কয়েকটি বৃহত্ কোম্পানি দেশের এলপিজি    ব্যবসাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। এলপিজি সেক্টরে বিরাজমান পরিস্থিতির উন্নয়নে গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এলপিজি বাজারজাতকরণের জন্য ৫৭টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছে। তার মধ্যে ২৭টি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। দেশে বছরে এলপিজি উত্পাদন ২ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে আগে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল। এখন দেশে ১৪টি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের সিলিন্ডার উত্পাদন কারখানা স্থাপন করেছে। তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আমদানি ও বাজারজাতকরণে নানামুখী ভ্যাট আরোপের ফলে এই খাতে বিনিয়োগকারীরা বিপাকে পড়েছেন।

এলপিজি ব্যবসায়ীরা জানান, আগে যখন আমদানি করতে হতো, তখন প্রতিটি সিলিন্ডার কিনতে ভোক্তাদের ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হতো। দেশে উত্পাদনের কারণে ভোক্তারা এখন প্রতিটি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনতে পারছেন। গত জুন পর্যন্ত এলপিজি সিলিন্ডার উত্পাদন পর্যায়ে ভ্যাট দিতে হতো না। কিন্তু চলতি অর্থবছরের বাজেটে এই খাতে উত্পাদন পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, যার কারণে দেশে উত্পাদিত সিলিন্ডারের মূল্য আমদানিকৃত সিলিন্ডারের চেয়ে বেশি হচ্ছে। সিলিন্ডার তৈরির কাঁচামাল আমদানি করতে বিভিন্ন পর্যায়ে শুল্ক দিতে হয়। আগে এক সিলিন্ডার (১২ কেজি) গ্যাসে ৯ টাকা ট্যারিফ ভ্যাট ছিল। গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে তা বাতিল করে বিক্রয়মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। এতে ভ্যাটের পরিমাণ ১ লাফে চার-পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

লাইসেন্স পাওয়া ও নবায়ন নিয়েও চলছে ব্যাপক হয়রানি। লাইসেন্স ফি নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। লাইসেন্স নবায়ন ফি সর্বনিম্ন ১১ লাখ টাকা এবং সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। এক্ষেত্রে নবায়ন ফি এক মাস আগেই পরিশোধ করতে হয়। এক দিন দেরি হলেই ২৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। চট্টগ্রাম ও খুলনায় বিস্ফোরক অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় থাকলেও এলপিজি ব্যবসা সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের কোনো ক্ষমতা নেই। লাইসেন্স প্রাথমিক ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় ঢাকায় অবস্থিত প্রধান বিস্ফোরক অধিদপ্তর। অথচ এলপিজি খাতের প্রতিষ্ঠান ও কারখানাগুলো রয়েছে চট্টগ্রাম ও খুলনা এলাকায়। কিন্তু স্থানীয় বিস্ফোরক অফিসগুলোতে জনবলের স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষমতা ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ছাড়াও পদে পদে তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

এদিকে ‘এলপি গ্যাস অপারেশনাল ও লাইসেন্সিং নীতিমালা ২০১৭’ প্রণীত নীতিমালায় এলপিজি বাজারজাত প্রতিষ্ঠানসমূহকে গ্যাসে ৫ হাজার টন মজুতের শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এই নীতিমালার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীরা উচ্চ আদালতে রিট করলে আদালত এসব শর্তের ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করে। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশের পরও মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন সময়ে চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা জারি করে মজুত ৫ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে এলপিজি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।

এ ব্যাপারে এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ ইত্তেফাককে বলেন, এলপিজির চাহিদা বাজারে ক্রমশ বাড়ছে। এটি অতি সম্ভাবনাময় খাত। কিন্তু নতুন প্রণীত মজুত নীতিমালার কারণে এলপিজি খাতের মাঝারি ও নতুন বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে কয়েকটি বড় কোম্পানি লাভবান হতে পারে এবং তারাই এলপিজি খাত একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। ৫ হাজার মেট্রিক টন মজুত নীতিমালার ওপর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলেও মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন চিঠির মাধ্যমে তা পালনে বাধ্য করা হচ্ছে। আমরা একটি সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করে এলপিজি খাতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ করছি।’