পুরনো ফেসবুক প্রোফাইলের ‘কাভার ফটো’তে আট বছর আগের কোনো এক দিনের মানববন্ধনের ছবি খুঁজে পায় সাব্বির রায়হান। মাথায় কালো ওড়না জড়িয়ে, ধর্ষণবিরোধী প্ল্যাকার্ড হাতে স্মৃতি থেকে একপ্রকার হারিয়ে যাওয়া এই ছবি, শতাব্দী প্রাচীন বেদনা-বিধুর কোনো কান্নার মতো বিউগল বাজিয়ে সাব্বিরকে নিয়ে যায় স্মৃতি-বিস্মৃতির মেমোরি লেনে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরুর দিকের কথা মনে পড়ে তার। ফেসবুক তখন ধর্ষণবিরোধী প্রতিবাদে তোলপাড়। নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয় সে। সাব্বির রায়হান তখন তরুণ। এ শহরে অভিবাসিত হওয়ার বয়স মাত্র দেড় বছর। এর মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে পাল্টেছে জীবনের ধাবমান ধারপাত। অন্য কোথাও, অন্য কোনো জীবন ফেলে, কবিতার কেমোফ্লেজ জড়িয়ে লেখক হতে চাওয়া তরুণ সাব্বির হেঁটে বেড়ায় শহরের অরক্ষিত রাজপথে। অচেনা শহর, অচেনা পথ, তাড়াতাড়ি সামলে ওঠে, ‘শেষ ট্রেনে বাড়ি না ফেরার অঙ্গীকার কিংবা পাল্টানো রিংটোন আর এ বেলার ডালভাতে ফুরিয়ে যাওয়ার’ জীবন। বিশাল বিলবোর্ড আর মানুষ দেখে কাটে বিরহের বেলা। রবীন্দ্রনাথ এসে যে প্রেমের অনুভূতি দেয়, সে প্রেম শৃঙ্খল ভেঙে কোথাও বেপরোয়া মজুদ করে রাখতে চায় জীবনের বিপুল বীজের ভাণ্ডার। আট নম্বর বাসে চড়ে ফার্মগেট-কাকরাইল, শরীরে ঘামের ঘ্রাণ, ট্র্যাফিক সিগন্যাল, সাবধানে রাস্তা পারাপারের নিয়ম, ওভারব্রিজ, ভ্রাম্যমান গণিকা, চন্দ্রিমা উদ্যান, হলের বারান্দার জীবন, আর জীবনের ‘বিপুল তরঙ্গ, সব গগন উদ্বেলিয়া— মগন করি অতীত অনাগত। আলোকে-উজ্জ্বল জীবনে-চঞ্চল একি আনন্দ-তরঙ্গ॥’ মোবাইলের নোটসে লেখে কবিতার আনাড়ি লাইন, ‘একটি আকাশ, একখানা চাঁদ।/ একটি স্বপ্ন অধরাই থাক।/ কাচের প্লেটের জল নকশা,/ রঙের ছোঁয়া পাক বা না পাক/ এই শহরের তপ্ত বুকে একটি ছেলে কাব্য লিখুক,/ এই শহরের সকল মানুষ সেই ছেলেটির সঙ্গে থাকুক,।’ এ যেন লেখক হতে চাওয়া কোনো তরুণের মামাবাড়ির আবদার। ফার্মগেট রাজাবাজারের কোনো নিম্নবিত্ত হোস্টেলের বহুকাল অযত্নে-অবহেলায় বহুল ব্যবহৃত কোনো অস্বচ্ছ আয়নায় মুখ দেখে জীবনের বিপুল বিবর্তনকে টের পায় সে। তখনো মৌলিক মুখোশে নিজেকে আড়াল করার কৌশল শেখেনি সে। ঠিকভাবে বুঝে উঠতে শেখেনি নাগরিক মানুষের মনীষা আর নগরজীবনের আভ্যন্তরীণ মনঃস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে। গ্রাম, মফস্বল আর আধাসামরিক এক মিশ্র জীবন কাটিয়ে শিশুর সারল্যভরা চোখে সাব্বির রায়হান তখন দেখছে নগরজীবনের বিবিধ প্রেক্ষাপটকে। ক্রমশ তার সরল চিন্তায় আঘাত হানছে নাগরিক হ্যামার। অবশ্য ততদিনে সে জেনে গেছে, যে শহরে এক গ্লাস পানিও টাকা দিয়ে খেতে হয়, সে শহরের মানুষের কাছে কোনোকিছু প্রত্যাশা করা ভুল। জেনেছে, ‘মানুষ তার চিবুকের কাছেও অচেনা ও একা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে সাব্বির ভর্তি হয়েছে নৃবিজ্ঞানে, কিন্তু জানে না সোশ্যাল সায়েন্সের এই ডার্লিং চাইল্ডকে সঙ্গী করে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের এক উন্নয়নশীল দেশে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারবে সে। ব্যবস্থা করতে পারবে দু’মুঠো অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদার। একটু সামান্য নিশ্চয়তা তখন মিলছে না পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকে, কেউই ঠিক বলতে পারছে না সে অমোঘ প্রশ্নের উত্তর; ‘এ জীবন লইয়া আসলে কী করিতে হয়?’ কিংবা এই পথচলা আসলে কদ্দুর। ঠিক কোথায় বা এ পথের প্রান্ত?’ বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট জুটেছে সেরেফ বারান্দায়, গিয়ে দেখতে পায় তারও তিন-চার বছরের সিনিয়রদের সিটও একইসঙ্গে বারান্দায় পাশপাশি। অচিরেই সে বুঝতে পারল, এদের গায়ে নন-পলিটিক্যাল ট্যাগ। ফলত রুমে সিট পেতে হলে স্লোগানে স্লোগানে কাঁপিয়ে দিতে হবে ক্যাম্পাস। ‘গেস্টরুমে’ হলের সিনিয়ররা তাকে শেখায়, হলে টিকে থাকার বিবিধ মূলমন্ত্র। সে শেখে, হলে থাকতে হলে পলিটিক্যাল বড়ো ভাইদের প্রতি হতে হবে অনুগত। কোনোকিছু নিয়েই প্রশ্ন করা যাবে না কখনো। জীবনকে অনেকটা কৌতূহল আর পরীক্ষার চোখ দিয়ে দেখা সাব্বির রায়হান ঠিক বুঝে উঠতে পারে না প্রশ্ন ছাড়া কীভাবে মিলবে আগামীর উত্তর। কিন্তু যে প্রশ্ন সাব্বির করতে চায় সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পায় না। ফলে আপাত নীরবতা পালন করে ভেতরে এক পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি জিইয়ে রাখার ব্রত নেয় সে। কৈশোরেও এরকম বাস্টার্ডাইজেশনের অভিজ্ঞতা আছে তার। এরকম পরিস্থিতে ‘ওয়াচ, ওয়েট অ্যান্ড সি’ যে সবচেয়ে ভালো সমাধান, জানা আছে তার। অবশ্য, এছাড়া আর কীইবা করতে পারে সে? বান্ধবহীন এ শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সিটখানা বড়ো অমূল্য তার কাছে।
এক উত্তাল সময় তখন। গণজাগরণের মৌসুম। চারদিকে স্লোগান উঠেছে, রাজাকারের ফাঁসি চাই। বিচার সবে শুরু হয়েছে। অন্য সবার মতো তরুণ সাব্বিরও রাজপথে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেয়, ‘ইচ্ছে যখন স্বাধীনভাবে বাঁচার।/ ভয় করি না তখন কোনো খাঁচার’। এক খাঁচা ভেঙে তখন সে মুক্তি পেয়েছে কেবল। কিন্তু ক্রমশ অনুভব করেছে মানুষের মুক্তি নেই কোথাও। কোনো এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি মানুষ। ফলে কোনো মুক্তিই মুক্তি নয়, নতুন কোনো শৃঙ্খলে বাঁধার পূর্বপ্রস্তুতি। ইতিমধ্যে সে জেনেছে সভ্যতার ইতিহাস মূলত শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস। হলের রুমগুলো দখল করে আছে ছাত্রত্ব শেষ হওয়া অগ্রজরা। কোনো কোনো রুম একাই দখল করে আছেন কোনো নেতা। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ছোটভাই নিয়ে কাটাচ্ছে চরম পুলকিত দিন। কথায় কথায় তারা আদর্শের কথা বলে ঠিকই, কিন্তু হলের ক্যান্টিনে রোজ বিনে পয়সায় খায়। চাঁদা তোলে। মতের অমিল হলেই ভিন্ন রাজনৈতিক ট্যাগ গায়ে লাগিয়ে মারধোর করে হল থেকে বের করে দেয়। অন্যদিকে বৈধ ছাত্রদের মেঘ-রোদ সব বাধা পার হয়েও রক্তচোষা কোনো কীট-পতঙ্গের সাথে পোকামাকড়ের ঘর-বসতি। এর নাম হল লাইফ তাহলে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা এক বাংলার শিক্ষক কৈশোরে সাব্বির রায়হানকে এই জীবনেরই গল্প শুনিয়েছিলেন তবে। বলেছিলেন, এ এমন এক জীবন যেখানে ডালের ওপর তেজপাতার মতো ভাসতে থাকে তেলাপোকা, তবু তাকে তেজপাতা ভেবে ফেলে দিতে হয়, অন্য কেউ দেখে ফেলার আগে। যেখানে দেখা মেলে এক টুকরো বাংলাদেশের। তেলাপোকা নিয়ে সে পড়ছে তখন উচ্চমাধ্যমিকের প্রাণিবিদ্যা বইয়ে, কিন্তু প্রতি বৃহঃস্পতিবার রাতে যাদের জন্য প্রস্তুত থাকে স্পেশাল ডায়েট, যাদের ডাইনিংয়ে শাদা উর্দি পরে অভ্যর্থনা জানায় বাটলার, আর অনুজরা প্লেটে তুলে দেয় খাবার, যেখানে রাত অবধি চলে ক্লাব ফুটবল ম্যাচের হই-হুল্লোড়, যে রাজত্বে মরি মরি এত আয়োজন, সে রাজত্ব আর ঐসব টিনেজদের কাছে এইসব দারিদ্র্যের গল্প নেহায়েত রূপকথা মনে হয়। ঐ বয়সে অনুরূপ রূপকথায় তেমন কারো আগ্রহ ছিল না। বহুকাল পর অনুরূপ জীবনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তার মনে পড়ে ওই বাংলা শিক্ষকের মলিন মায়াবী মুখ।
জীবন থেকে একটা প্রাক্তন ‘এলিটনেস’ তখন মুছে যাচ্ছে ধীরে। সাব্বির রায়হান টের পায়, বিলাসিতা বিদায় নিয়েছে জীবন থেকে বহু আগে, এখন শুধু মৌলিক চাহিদার জন্য অপরিমেয় স্ট্রাগল। এ যেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে দু’দণ্ড মুক্তি চেয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া মেরুদণ্ডকে নতুন করে দাঁড়া করাবার চেষ্টা। নাগরিক বিষণ্নতা গায়ে মেখে ম্যাকাও পাখির মতো মন খারাপ করে বসে থাকার দিন তখন তার। অবাধ স্বাধীনতার স্বাদহীনতায় আক্রান্ত হবার মৌসুম। বহুরকম অস্ত্রশস্ত্র আর ঢাল-তলোয়ার নিয়ে এই শহরে টিকে থাকার অপূর্ব রণ-কৌশল ক্রমশ আয়ত্ত করে ফেলছে সে। শিখছে, বিবিধ আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা থেকে উঠে আসা হরেক রকম ‘হ্যাবিটাস’ থাকা মানুষের সঙ্গে আচরণের নিয়ম-কানুন আর যোগাযোগের ভাষা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে হল থেকে দীপ্ত পদক্ষেপে সে হেঁটে যায় মধুর ক্যান্টিনের দিকে। কিন্তু কেন এ স্লোগান, কেনই বা সে চাইছে ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাক অন্যায়’ একটা স্বাধীন দেশে, জানে না সে। রাজনীতি নিয়ে তেমন কোনো জ্ঞান নেই তার তবে ভেতরে আছে দেশপ্রেম। ঐ বয়সে যেমন সবার থাকে। সাব্বির অনুভব করে ইতিমধ্যে কিঞ্চিৎ বিপ্লবীও হয়ে উঠেছে সে। হলের এক সিনিয়র, বাম সংগঠনের নেতা প্রায়শ রাতেই তাকে শোনায় বিপ্লবের মন্ত্র। সে পর্যবেক্ষণ করে, একই শার্ট পরে দিনের পর দিন কাটানো সেই নেতার ‘প্রলেতারিয়েত’ মুখ থেকে অনবরত বের হচ্ছে ‘বুর্জুয়া’ বেনসন সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এই কুহক ঠিকভাবে বুঝতে পারে না সে। ভার্সিটির অ্যাকাডেমিক কোর্সের সিলেবাসে কার্ল মার্ক্স, ক্যাম্পাসের তরুণদের টি-শার্টে চে, ব্যাগের ওপর ক্যাস্ত্রোর মুখ। মিছিল-মিটিং, লিফলেট, চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া দিন আর নোনতা বিস্কিটের যুগলবন্দি জীবন। কেতলি পাড়া কিংবা মন খারাপের ওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছাত্রী হল থেকে ভেসে আসা গানের সুর, ‘তুমি হও যমুনা রাধে, আমি ডুইবা মরি’। যেন বা কোনো ঘোরলাগা মাতাল হাওয়া এলেমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে তখন সাব্বিরের চেনা পৃথিবীকে। হৃদয় জুড়ে উথাল-পাথাল প্রেমের দাবানল, সমস্ত বনভূমি উজাড় করে কেবল তার নিকটে এসেই নিষ্প্রভ। সেইসব জাদুবাস্তবতার দিন তখন, সোনাভরা, মুক্তো ছড়ানো দিন। হৃদয় জুড়ে ওলট-পালট ভাঙচুর আর সভ্যতা জুড়ে মোমবাতি আর মশাল মিছিল। সাব্বির রায়হান ভাবে।
এ জীবন নিয়ে সামান্য কোনো ধারণা ছিল না তার। যে বিচ্ছিন্ন পরগণায় লেখাপড়ার সূত্রে সে ছিল, সেখানে এ পৃথিবীর কোনো ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনায় কারো কিছু যায় আসত না। ব্রিটিশ ধারণায় নির্মিত সেনানিয়ন্ত্রিত এমন এক সাম্রাজ্য যেখানে জন ও জীবনের মাঝে শুধু সংযোগসেতুটাই ছিল না। বাকি সবই ছিল প্রয়োজনের অধিক, বিপুল প্রাচুর্য নিয়ে। ছিল জুতো-জামা-প্যান্ট, কাঁটা চামচের টুংটাং সুর, সাজানো গোছানো পরিপাটি বেড, অক্সফোর্ড জুতো্, ডরমেটরি, খেলার মাঠ আর মখমল ঘাস। ছিল ‘জীবন কর্মময়’, ‘সুইট সেইভস ব্লাড’, ‘বর্ন টু ডেস্ট্রয়’ কিংবা ‘সাফল্য আমাদের লক্ষ্য’র মতো রক্তে আগুন লাগানো মোটো। ছিল নিস্তরঙ্গ পুকুর আর অস্বচ্ছ জোছনার আবছায়া মায়াবী আলোয় ভেসে যাওয়া প্রাচীন ছাদ। ফলে, এ পৃথিবীর কোথায় কে ধর্ষিত হলো, কোথায় কার কান্না ঘন হয়ে এল জারুল বনে, কোথায় কোন পেঙ্গুইনের নিঃসঙ্গতা কাটাতে বানানো হলো পাথরের পেঙ্গুইন, সেসবে কোনো ভাবান্তর হবার সুযোগ ছিল না কারো। বিবিধ নির্মাণ-বিনির্মাণের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে তরুণ সাব্বির রায়হানের চিন্তাজগতের তখন ক্রমশ বিবর্তন ঘটছে। সে দেখতে পায় সমুখে জীবনের সুকঠিন কংক্রিট বিছানো পথ। তার মনে পড়ে, ‘হাউস’ নামের আধাসামরিক ছাত্রাবাসের দেয়ালে সাঁটানো সাঁওতাল দম্পতির চিত্রকর্ম আর প্লাইউডে রং দিয়ে লেখা কবিতার লাইন, ‘জীবন থেকে সোনার মেডেল,/ শিউলি-ফোটা সকাল নেবো'-এর কথা। জীবন থেকে সোনার মেডেল আর পাওয়া হয়নি সাব্বির রায়হানের। এর পরিবর্তে সে পেয়েছে, জীবন ম্যাচের অদ্ভুত পেনাল্টি; এক আশ্চর্য লালকার্ড। আন্তঃসার্ভিস সিলেকশন বোর্ড থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে তাকে। নিয়োগকর্তারা তাকে সেরেফ জানিয়েছেন, ‘এই চারদিনের বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা আর পর্যবেক্ষণের ফল বিশ্লেষণ করে বোর্ড এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ভবিষ্যতে সামরিক বাহিনীতে সার্ভিস দেওয়ার যোগ্যতা এখনো তার মাঝে পরিলক্ষিত হয়নি। ফলত, গায়ে জলপাই রং উর্দি জড়ানোর প্রশিক্ষণের সুযোগ, এবারের মতো তাকে দেওয়া যাচ্ছে না।’
সাব্বিরের স্পষ্ট মনে আছে, বৃষ্টিভেজা এক বিষণ্ণ বিকেলে চৌকো লাল টিকেট ধরিয়ে দেওয়ার আগে প্রধান নিয়োগকর্তা তাকে বলেছিলেন, ‘জীবন এক দীর্ঘ নদী। যেখানে সে ঢুকতে চাইছে তা মূলত একটা খাল। নিশ্চয়ই জীবননদী কোনো একদিন পতিত হবে সমুদ্রে।’ ঐ অল্প বয়সের চাকরিটা তখন তার বেশ দরকারই ছিল। কিন্তু ঐ লাল টিকেটের বদৌলতে জীবন নামের রেলগাড়ি তাকে নামিয়ে দিয়ে গেল অচেনা এক স্টেশনে। একাকী পথিকের মতো গন্তব্যহীন যাত্রা অচিরেই তাকে টেনে নিয়ে এলো বেদনার এক মহাসমুদ্রের নিকটে। কিন্তু এই মহাসাগরের ঠিক কোন প্রান্তে ডুব দিলে মিলবে অপূর্ব মণি-কাঞ্চন, জানা নাই তার। তবে সে অনুভব করতে পারে, পর্যাপ্ত অক্সিজেন বুকে না নিয়ে জীবনের এই মহাসমুদ্রে ডুব দিতে নেই। কিন্তু কে দেবে তাকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন? জীবন তো একারই সন্ন্যাস, বয়োজ্যেষ্ঠ কবি যেমন বলেন। চারদিকে জীবনের সুতীব্র রসিকতা তখন। পূর্ব জীবনের খোয়ারি কেটে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে নতুন কোনো অবশ্যাম্ভাবী ‘পিনিক’। যেখানে ঠিক প্রাচুর্য নেই ঠিকই কিন্তু আছে এমন কিছু যা ঠিক ধরা দিয়েও ধরা দিচ্ছে না তার কাছে। আছে ‘দুপুর রৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা, রাত্রির মাঠে চিৎ হ’য়ে শুয়ে থাকা... কবিতার কাছে হাঁটু মুড়ে বসা, ছুরির ঝলক/ অভিমানে মানুষ কিংবা মানুষের মতো আর যা-কিছুর বুক চিরে দেখা আত্মহনন,/ শহরের পিঠ তোলপাড় করা অহংকারের দ্রুত পদপাত’। মেঘ কিংবা পাখির কাছে নালিশ আর জলের অতলে গিয়ে মাছদের কাছে খুলে বলা প্রেমিকার অবহেলা আর অভিমানের কথা। আছে জীবনের প্রতারণা থেকে মুক্তি পেয়ে শিল্পে ঠাঁই খোঁজার অব্যক্ত চেষ্টা; উচ্ছনে যাওয়া কবিতার লাইন ‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই’।
এক ঘোর অনিশ্চয়তার দিকে যাত্রা কেবল শুরু। ‘অনিশ্চয়তাই জীবনের সম্পদ’ জেনে ক্রমশ যুবক হয়ে উঠছে সাব্বির রায়হান। প্যাগানদের মতো ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়া প্রোফেটিক ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো Seer-এর নেই তার, জানা নেই এ শহরে কেমন করে প্রেম হয়, গড়ে ওঠে সম্পর্কের সমীকরণ। কলাভবনের ৩০৫৪ নম্বর কক্ষে তখন সে পড়ছে সভ্যতার বিবর্তন, প্যালিওলিথিক, নিওলিথিক, ব্রঞ্জ আর পাথরযুগের কথা। শিখছে পরিসংখ্যন, সৃষ্টিতত্ত্ব, বিবর্তনবাদ, রেনেসাঁ, আলোকময়তা। এসব পালটে দিচ্ছে তার চিরচেনা চিন্তার জগৎ। পূর্বের জীবন স্মরণ করে সাব্বির রায়হান লিখছে, ‘একই বৃত্তে বারেবারে ঘোরা, খাকি দিয়ে মোড়া জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলাম বেশি, একই চত্বরে... বুঝতে পারিনি মিছিল মিটিং হাহাকারভরা একটি নগরী... ছয়টি বছর বুঁদ থেকে থেকে বাস্তবতার পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিয়েছি নিজেকে অনেক, ছয়টি বছর পরেই তাই শিখছি আসল জীবনপ্রণালী, শিখছি সমাজ, সামাজিকতা দর্শন আর খুঁটিনাটি সব। আমিও এখন আমজনতা বিবর্তিত একটি মানুষ।’ আক্ষরিক অর্থেই তখন একজন আমজনতা সে। তার মনে পড়ে, ঐ আধাসামরিক বিদ্যাপিঠের অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এ যাওয়ার পথে একটা সাইনবোর্ডের কথা। যেখানে লেখা ছিল,‘সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’। ঐ পথ ধরে যাওয়ার অনুমতি ছিল কেবল তাদের। ‘সর্বসাধারণ’ থেকে তারা যে আলাদা এই শিক্ষাই তাকে দেয়া হয়েছে ঐ চত্বরে। কিন্তু ঐ চত্বর থেকে বেরিয়ে এই গরিব দেশে সর্বসাধারণ থেকে আলাদা হওয়া তার ওই সাহেবি জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সুসজ্জিত ডাইনিং-এ প্রাত্যহিক প্রাতরাশে ব্রেড-বাটার-জেলির বদলে এই নগরীর রাস্তার ধারের টং দোকান থেকে দিনমজুরদের সঙ্গে অজস্রদিন ভাগাভাগি করে সে খেয়েছে বাটার-বান আর কনডেন্সড মিল্কের চা। একটা কলাও জোটেনি ভাগ্যে তার। বহুদিন, ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতো লোকাল বাসে ঝুলে গন্ত্যবে ফিরেছে সে। এই ফাটকাবাজির দেশে স্বপ্নের পাখিকে ক্রমশ মরে যেতে দেখেছে সাব্বির। এই নগরে পরম্পরায় পাওয়া কোনো সম্পদ নেই তার, অপেক্ষায় নেই সুসজ্জিত ডায়নিংয়ে রকমারি খাবারের আয়োজন, নেই ব্যক্তিগত কোনো কক্ষ কিংবা একটু পারিবারিক জীবনের স্বাদ। ফলে, অচিরেই এই নগরীর আর দশটা অভিবাসিত মানুষের মতোই সর্বসাধারণের জীবন হয়ে ওঠে তার। নিদারুণ সংগ্রাম আর টিকে থাকার চেষ্টারত বড়ো বেরঙিন দিন।
ছবির দিকে তাকিয়ে এইসব মনে পড়ে সাব্বির রায়হানের। মনে পড়ে, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যাওয়ার আগে এক বন্ধুই টেনে নিয়ে গিয়েছিল তাকে মিছিলে। ঐ বন্ধুটিও বাম দলের রাজনীতি করে। বিপ্লবকে দীর্ঘজীবী করার চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বাদ দিয়ে দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রমে মগ্ন সে। সাব্বিরকে সে জানায়, কেউ একজন ধর্ষিত হয়েছে। এ জন্যেই মিছিল আর মানববন্ধনের আয়োজন। কবিতা নয়, এখন স্লোগান লেখার দিন। স্লোগানে-স্লোগানে কাঁপিয়ে দিতে হবে রাষ্ট্র নামের এই যন্ত্র। শুধু বসে থেকে কবিতা লিখলে চলবে না আর। সুবিধাভোগী মধ্যবিত্তের সন্তান উৎপাদনের পৌণঃপুনিক ধারাবাহিক সামাজিক জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। জন্মালে রেখে যেতে হবে দাগ, যেমনটা বলেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। এইসব ভাবনা তরুণ সাব্বিরকে এলোমেলো বিভ্রান্ত করে দেয়। নিতান্তই নিজের জন্য নিরীহ মোলায়েম প্রেমের কবিতা লেখে সে। বিপ্লবের ভাষা জানা নেই তার। তার মতো এক অবার্চীন কিভাবে দাগ রেখে যাবে এই পৃথিবীতে, ভাবে সে। তবু সে লেখে, ‘চারদিকে ধর্ষক/ আমরা নীরব দর্শক’। লাল আর কালো কালি দিয়ে প্ল্যাকার্ডে এই লাইন দুটোকে সঙ্গী করে মোটো আর স্লোগানকে আলাদা করতে পারার ম্যাচ্যুরিটি নিয়ে অন্য অনেকের মতো মানুষের মিছিলে অংশও নেয় সে। সেদিন পুরনো এক পাঞ্জাবির সঙ্গে মাথায় কালো ওড়না বেঁধেছিল সাব্বির রায়হান। তখন একটা কালো ওড়না রাখত সে নিজের কাছে সবসময়। যে ওড়না প্রেমিকার নয়, বান্ধবীর নয়, নেহায়েতই কোনো আত্মীয়ের ওয়ার্ড্রবের পরিত্যক্ত কাপড় থেকে তুলে আনা। লুই কানের নকশা করা সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের প্রথম মানববন্ধনে সাব্বির রায়হান পড়েছিল এক অগ্রজ কবির কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তার নতুন লেখা কবিতা,
‘লাল চুড়ি দেবার কথা ছিল তোমায়।
কথা ছিল এই বসন্ত পেরোলেই;
আগামী বৈশাখে সূর্যের যে প্রচণ্ড দাবদাহ
তোমার হৃদয়কে করবে উত্তপ্ত, খণ্ডিত বিখণ্ডিত
তখন কিছু লাল চুড়ি দেব তোমাকে।
তখন মিছিল হবে মিটিং হবে
হবে মানববন্ধন, ভালোবাসার দীপাবলি জ্বেলে
তুমিও থাকবে মিছিলে।
থাকবে লাল চুড়ি, থাকবে ঝংকার তোলা অজস্র হাত।
প্রিয়তমা তোমার হাত এখন অজস্র মৃত্যুর রক্তে লাল হয়ে আছে
তোমার অধর এখন প্রকম্পিত, উচ্ছৃঙ্খল
নয় নম্বর বিপদ সংকেতের মতো ভয়াবহ,
তোমার হাতে এখন মশাল, সংগ্রামী চেতনার মন্ত্র
আগামী সূর্যের তেজোদীপ্ত উত্তাপ
এখন তোমার হাতে চুড়ি পরার সময় নেই
সময় নেই বিলাসিতার
এখন তুমি নক্ষত্র রাতের মতো ছিন্ন ভিন্ন ফুটো হয়ে যাওয়া আকাশ
এখন তোমার আঁচলে নেই মমতা
নেই খোপায় বেলী কিংবা মুক্ত রজনীগন্ধ্যা।
এখন তুমি স্থান থেকে বিচ্যুত, আরো বিচ্যুত,
অগ্ন্যুতপাতের মতো তোমার চাহনী
যেখানে নেই কাজলের বিন্দুমাত্র চিহ্ন।
এখন তোমার নখের আঁচড়ে
এক পৃথিবীর হিংস্রতা ধ্বংস হয় সহজে।
এখন তুমি নারী কমান্ডো
আর্টিলারির মতো কামান চালাও দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে।
আমি সেই হাতে কিভাবে চুড়ি পরাব বল?
তুমি এভাবেই জেগে উঠবে
হবে প্রতিবাদী, আমার কবিতায় নেবে ঠাঁই
সুসজ্জিত উপমায় নয়
সংগ্রামী চেতনায় আমি তোমায় পেতে চাই।’
কবিতা পড়া শেষ করে সে অনুভব করে, চারদিকে তীব্র কথার কোলাহলে তার এ কবিতা শব্দদূষণ হয়ে মিশে গিয়েছে নগরীর বিষাক্ত বায়ুমণ্ডলে। খুব অসহায় আর অস্বস্তিবোধ হয় তার। সাব্বির রায়হানের সেদিন মনে হয়, বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা সে। ফলত, এইসব কবিতা দিয়ে কোনোদিন আসবে না কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব। কিংবা সামান্য কোনো পরিবর্তনও। টের পেয়েছিল সে। এরপর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে খসে পড়ে অনেক অনেক দিন-সপ্তাহ-মাস-বছর। আসে, নতুন এক দশকের সূচনালগ্ন। মহামারি-মৃত্যু এসে বিপর্যস্ত করে দেয় চেনা পৃথিবীকে। শুরু হয় সভ্যতার পাতাঝরা দিন। হঠাৎ পুরো দেশ পরিণত হয় এক অস্বস্তিকর জনপদে। তরুণ সাব্বির তখন যুবক। বিপন্ন এক সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে ছবিটি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তারুণ্যের সেই দিনগুলোতে। সে অনুভব করে, আসলে কিছুই পাল্টায়নি এই এক দশকে। সবকিছু আছে আগেরই মতো। আছে ধর্ষণ-হত্যা-গুম-মিছিল-মিটিং-সমাবেশ-মানববন্ধন। আছে ধর্ষণবিরোধী স্লোগানে মুখরিত নগরীর বুক, প্ল্যাকার্ডে- প্ল্যাকার্ডে ছেয়ে যাওয়া মানববন্ধন, নেটিজেনদের সেলিব্রেটি ন্যারেটিভ, সম্মিলিত শোকের প্রতীক হয়ে কালো প্রোফাইল পিকচারে ঢেকে যাওয়া মৌলিক মুখ আর দেশজুড়ে একযোগে বুকে বয়ে বেড়ানো অবিকল সেই পুরনো অস্বস্তি-আশঙ্কা-ভয়-নাজুকতা। আছে তীব্র রিলিজিওসিটি-অন্ধবিশ্বাস-বিপন্নতা-গোড়ামি-গুজব-গজব আর মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার আদিম বুনো উল্লাস।
এইসব ভেবে ভীষণ আক্রান্ত বোধ করে সাব্বির রায়হান। অথচ, কথা ছিল এ পৃথিবী হবে প্রেমের, সাম্যের। প্রেমিক-প্রেমিকেরা নগরীর বুকে অলংকার হয়ে ফুটে রইবে। মানুষ মানুষকে শোনাবে আশাজাগানিয়া কোনো গান। কথা ছিল, ক্ষমতা নয়, মমতা ও সমতার চর্চা হবে সর্বত্র। সবগুলো গুম, হত্যা, ধর্ষণের বিচার হবে এতদিনে। আইন সমান হবে সকলের জন্য। বহু মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া এ দেশের কোথাও থাকবে না কোনো ধর্ষণ, খুন কিংবা হত্যার সংবাদ। ধর্ম অবমাননার দায়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে ফেলবে না কেউ। কেউ ভাঙবে না প্রতিমা। সবাই সবার ধর্ম পালন করবে যে যার মতো। নিঃশ্বাস চেপে ধরার মতো কেউ কারো বিশ্বাস চেপে ধরবে না কোনোদিন। কথা ছিল সুদিন আসবে। নগরীর অগ্রজ কবি চল্লিশ বছর আগে যেমনটা লিখেছিলেন, ‘কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা।/ ...কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে, পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের/ সকালে ওম নেবে জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে। কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে/ আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে’। এই চার দশকে তবে কি আমাদের সব কথা ডুবে গেল অতল তিমিরে? ভাবে সে। ক্রমশ সবকিছু কেমন এলেমেলো হয়ে যেতে দেখে বিহ্বল বোধ করে সে। অনুভব করে ‘নষ্টফুলের পরাগ মেখে পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন’ হয়ে যাচ্ছে কেবলই। শক্তি ক্রমশ কেমন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে দিন দিন। ভীষণ অরক্ষিত হয়ে যাচ্ছে বহু প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই সোনার বাংলা। এ পৃথিবীর সর্বময় ক্ষমতা চলে যাচ্ছে তাদের-ই হাতে যারা কোনোদিন মমতার চর্চা করেনি। যাদের হৃদয়ে বসত করে ‘ঈর্ষা, গসিপ, এরোগেন্সের ক্যাকটাস কাঁটা’। ভাইকিংস কিং রগনার যেমন বলেন, ‘Power is dangerous. It corrupts the best and attracts the worst. Power is only given to those who are prepared to lower themselves to pick it up.’
বিচ্ছিন্ন থেকে আরো বিচ্ছিন্ন প্রেক্ষাপটে এই বিপর্যস্ত সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব একা মনে করে সাব্বির রায়হান। কিন্তু এক সুবিশাল সিস্টেমের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কীই বা করতে পারে সে? ম্যাক্স ভেবারের এলিয়েনেশনের সূত্র জানা আছে তার। ভেবার যেমন এসবের মূলে রাজনীতিকেই দোষারোপ করেন। বলেন, ‘আমলাতন্ত্র মানুষকে আইনি যুক্তিসঙ্গত কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ‘অথোরিটি’ আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে ক্রিয়াশীল ফর্ম যা মানুষের চারপাশে তৈরি করেছে এক ‘লোহার খাঁচা’। ‘অথোরিটি’কে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে মানুষ হারিয়ে ফেলতে পারে তার মৌলিক মূল্যবোধ, আবেগ কিংবা ‘শাশ্বত সত্য’ বলে বিবেচিত মানবিক বিষয়াদি। মানুষ যখন অনুভব করবে, লোহার খাঁচা থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই, কোনো নিয়মই সে ভাঙতে পারছে না আর। তখন সে গতির সাথেই নিজেকে মানিয়ে নেবে, অন্যদিকে হারিয়ে যেতে থাকবে আবেগ, মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো। ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হৃদয় থেকে শুধু আর্তনাদ ভেসে আসবে, ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে?’
এই সময়ের বুকে লেগে থাকা ক্ষত আর ক্ষতি পেরিয়ে সাব্বির রায়হান মনে করার চেষ্টা করে বিপ্লবী শিল্পীর সে গান, ‘তবু কিছু যায় না বলা,/ শব্দ খেলায় কেবল ফাঁকি।/ কথার পিঠে কথা সাজাই,/ আমরা এখন একলা থাকি’। সে ভাবে, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কেউ কি আছে চেনা কথার বাইরে শুনবে বা শোনাবে নতুন কোনো কথা? দেখাবে নতুন কোনো সম্ভাবনার পথ। করপুটে ঢেলে দেবে মমতার মিশ্রিত রোদ্দুর। চেনাপথের বাইরে এসে বুকের আগল খুলে দাঁড়িয়ে একান্তে বলবে, ‘তোমার বুকের আগল খোল’।
ইত্তেফাক/আরএ
