চোখ ফেরানো যাক বিগত শতাব্দের সত্তর দশকে—বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বছরটিতে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর— মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের মাত্র দুদিন আগে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটেছিল?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তাঁর ৭ বছর বয়েসি পুত্র সুমন হায়দার চৌধুরীকে বলছিলেন, ‘স্বাধীনতার আর বেশি দেরি নেই, দেখছ না প্লেনগুলো কেমন নিচ দিয়ে উড়ে গিয়ে বোমা ফেলছে, কেউ বাধা দিতে পারছে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বাধীন হয়ে যাব আমরা, ওরা আর ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।’
ওঁরা মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পুরো সময়টাই ছিলেন ফুলার রোডে। ১১ ডিসেম্বর চলে আসেন ছোটভাই লুতফুল হায়দার চৌধুরীর বাসায়, শান্তিবাগে। ১৪ ডিসেম্বর সেখান থেকেই মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে নিয়ে গিয়েছিল আলবদরেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার আরেক শিক্ষক নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর বড়ভাই কবীর চৌধুরী জানাচ্ছেন, ‘১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর দুপুরবেলা, স্বাধীনতার মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে, আমাদের ধানমণ্ডি সেন্ট্রাল রোডের পৈতৃক বাড়িতে মুনীর ম্লান শেষ করে চুল আঁচড়াচ্ছিল। মা তার খাবার বেড়ে দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন সময় দখলদার পাক সেনাবাহিনীর বর্বর ফ্যাসিস্ট সহযোগী আলবদরের লোকেরা গাড়ি নিয়ে এসে মুনীরকে বলল যে ওকে তাদের সঙ্গে একটু যেতে হবে, খানিকক্ষণ পরে তারা ওকে ফিরিয়ে দিয়ে যাবে। মা মুনীরকে কিছু খেয়ে নিতে বলেছিলেন। মুনীর বলেছিল ফিরে এসে খাবে।...’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রভাষক ন আ ম ফয়জুল মহীর সহকর্মী ম. ওবায়দুর রহমান লিখেছেন, ‘...১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর সকাল ৮টায় পাকিস্তানিদের দোসর ঘাতক আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ড. মহীকে তাঁর ফুলার রোডের বাসা থেকে নিয়ে গিয়ে রায়েরবাজারে চোখ বাঁধা অবস্থায় নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করে।’
....
‘মুনীর চৌধুরী, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, আনোয়ার পাশা, রাশীদুল হাসানের মতো শত শত বুদ্ধিজীবীকে ঘাতক আলবদর বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে—তাঁদের আর কোনো খোঁজ নেই।’
মুক্তিযুদ্ধ শুরুই হয়েছে গণহত্যা দিয়ে। প্রতিদিন সারা দেশে হত্যার উত্সবে মেতেছে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তাদের দোসর এদেশীয় দালাল স্বাধীনতাবিরোধীরা শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিত্সক, প্রকৌশলী, শিল্পী-সাহিত্যিকসহ নানা পেশার মানুষকে। বিজয়ের দিন যখন এগিয়ে আসছিল, তখন কারফিউ দিয়ে বুদ্ধিজীবী নিধন শুরু করে—যাতে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বাঙালি মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত হয়। সেই অগণিত শহিদের মধ্যে ২৮৬ জনের স্মৃতিসংগ্রহ ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ বাংলা একাডেমির সেরা প্রকাশনা অবশ্যই। স্মৃতিচারণ করেছেন শহিদের স্বজনেরা। সে কারণে স্মৃতিচারণগুলো যেমন খাঁটি, তেমনি ইতিহাসের নিরাভরণ নানা উপাদানে সমৃদ্ধ।
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম খণ্ডটি। এ-ধরনের প্রকাশনার পরিকল্পক ছিলেন বাংলা একাডেমির তত্কালীন মহাপরিচালক শিক্ষাবিদ কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল। ‘প্রসঙ্গ-কথা’য় তিনি লেখেন, ‘...অবরুদ্ধ দেশে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী ও তার দোসরদের হাতে যাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁদের কথা কি সবাই ভুলে গেছে? না। জননী, জায়া, সন্তান ও সহকর্মীদের চোখ এখনো অশ্রুতে ভিজে ওঠে যখন প্রতি বছর একটি বিশেষ দিন এসে দরজায় কড়া নাড়ে—যেন শাদা রুমালে মুখ-ঢাকা নিষ্ঠুর ঘাতক।’
‘বাংলাদেশের শহরে-বন্দরে গ্রামে-গঞ্জে এরকম কত রক্তাক্ত মা-বোন ভাই-বন্ধু, পত্নী-প্রিয়জন শোকের দুর্বহভার আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন, তার নির্ভুল হিসাব আমরা কেউ জানি না।...’
‘শোকের দুর্বহভার’ জানাবার তাড়না থেকেই ২০০০ সাল পর্যন্ত মোট তেরোটি খণ্ড প্রকাশিত হয়। সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার। খণ্ডগুলো দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ায় এবার চার খণ্ডে প্রকাশ করা হয়েছে। সম্পাদক রশীদ হায়দার পুনর্বিন্যাসকৃত এই সংস্করণে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের এই ঐতিহাসিক সংকলন প্রসঙ্গে আমার প্রথম সবিনয় নিবেদন— সম্পাদক হিসেবে আমার নাম মুদ্রিত হলেও আমি নিজেকে কখনোই ‘সম্পাদক’ বলতে চাই না; বলি, ‘সংগ্রাহক’।....আমি দৃঢ়তার সঙ্গেই বলতে চাই, এই দুঃসহ কথামালা সম্পাদনা করা সম্ভব নয় বলেই, মহাপরিচালক ড. কামালের পরামর্শ ও নির্দেশ অনুসারে আমি শুধু সচেষ্ট থেকেছি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে উল্লিখিত বুদ্ধিজীবী কবে, কোথায়, কার দ্বারা, কীভাবে শহিদ হয়েছেন, সেই তথ্যগুলিই যথাযথ রাখতে।...’
চার খণ্ডে ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ প্রকাশের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধান করেছেন বাংলা একাডেমির গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগের পরিচালক মোবারক হোসেন। প্রকাশনাটি পাঠককে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ধারাবাহিক পাঠে তৃষ্ণা জোগাবে। বলতে চাই—১৯৭১-কে জানতে হলে ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ দিয়েই শুরু করা উচিত।
