বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯:৪৪

গতকালের পর

শেষ রাতের দিকে গোলাবর্ষণ কিছুটা হালকা হয়। মুক্তিবাহিনী তখন বৃষ্টির অপেক্ষা করছে। বৃষ্টিতে শত্রু সেনারা একটু বেকায়দায় পড়বে। তিনদিন পর খাবার এসে পৌঁছালে সবার মাঝে বিতরণ করা হয়। সৈন্যরা খাবার খেতে শুরু করে, মোস্তফা খাবার মুখে দেবার অপেক্ষা, এমন সময় বৃষ্টি শুরু হলো। মুক্তিসেনারা বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। পাকবাহিনী বৃষ্টির মধ্যেই তাদের আক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। মোস্তফার দল বৃষ্টিতে পা দিতে ঠাণ্ডায় কাঁপতে থাকে। বৃষ্টিতে সুবিধা নেবার পরিবর্তে আরও বেকায়দায় পড়ে যায়। এদিকে শত্রু সেনারা বৃষ্টি উপেক্ষা করেই এগিয়ে আসছে আর গোলাবর্ষণ করছে। মোস্তফা ভয় না পেয়ে এলএমজি দিয়ে প্রতি আক্রমণ করতে থাকলেন।

কিন্তু শত্রুসেনারা সংখ্যায় ছিল অনেক। তারা দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর তিন দিক দিয়েই দরুইন প্রতিরক্ষা ঘাঁটির দিকে আক্রমণ চালাতে থাকে। শুধুমাত্র পূর্বদিকটা মুক্তিসেনাদের জন্য নিরাপদ মনে হয়। এমতাবস্থায় পশ্চাদপদ অনুসরণ করা ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। কিন্তু পালাতে গেলে তিনদিক দিয়ে আক্রমণের মুখে পড়ে সকলকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। কেউ যদি গোলাবর্ষণ করে শত্রুদের আটকে রাখতে পারে, তবেই বাকিরা পালাতে পারে এবং সকলের প্রাণ রক্ষা হয়। আর যে আটকে রাখবে, নিশ্চিত সে মৃত্যুমুখে পতিত হবে।

কী আর করা, মোস্তফা কামাল যেহেতু এই দলের নেতা, তিনি তো নিজে বেঁচে অন্যদের কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারেন না। নিজেই এই দায়িত্ব নিলেন। কাভারিং ফায়ার চালিয়ে সবাইকে বললেন পূর্বদিকে পালিয়ে যেতে। তাঁর লক্ষ্য কেবল একটিই-সহযোদ্ধা সৈনিকদের জীবন বাঁচানো, নিজের জীবন তাঁর কাছে তুচ্ছ। পিছনের সেনারা তাঁকে সরে আসার সংকেত দেয়, কিন্তু তিনি গুলি চালিয়ে যেতে থাকেন। মোস্তফার কাভারিং ফায়ার শত্রুদের এগুতে দেয় না, অন্যদিকে নিজের সৈন্যদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দেয়। শত্রুরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে মেশিন গান ও হাল্কা মর্টারের সাহায্যে গোলাবর্ষণ করতে থাকে। মুক্তিসেনাদেরও নয়-দশজন শহিদ হন। শত্রুরা পঞ্চাশ-ষাট গজ এর মধ্যে পৌঁছে যায়। এই সময় বীর সিপাহি মোস্তফা কামাল এর গুলি শেষ হয়ে যায়। ফলে শত্রুপক্ষকে আর আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। হঠাত্ একটা গোলার আঘাতে তাঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়। দরুইন থেকে ফেরত আসা মুক্তিযোদ্ধারা আখাউড়া চলে আসে এবং মেজর শাফায়াত জামিল আরও পিছনে ভারত সীমান্তে মনতলায় চলে যান। পাকিসেনারা সেই যুদ্ধে সাময়িক জয়লাভ করে নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে যায়। তারা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ট্রেঞ্চের ভেতর মোস্তফা কামালের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ দেখতে পায়। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তারা নিজেদের রাগ মিটিয়েছে। গ্রামবাসীরা পরে দরুইন গ্রামে মোস্তফা কামালকে সমাহিত করে।