ব্রেক্সিট বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ের যাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি বিদায়ি ঘণ্টা বেজে উঠলেও মহাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের মুক্তবাণিজ্য সম্পর্ক এখনো অব্যাহত আছে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দুই পক্ষকে এ বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলে উভয় পক্ষই মুক্তিবাণিজ্য সম্পর্ক হারাবে।
স্পষ্টতই আলোচনা চূড়ান্ত করতে দুই পক্ষের হাতে খুব অল্প সময় আছে। ব্রাসেলসে দুই পক্ষের মধ্যে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আলোচনা চললেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে কোনো চুক্তি ছাড়াই বা নো ডিল বেক্সিট হবে। এখন পর্যন্ত আলোচনা যত দূর গড়িয়েছে তা আশাব্যঞ্জক নয়। শেষ পর্যায়ে এসে দুই পক্ষই একে অন্যের কাজ থেকে যতটা সম্ভব ছাড় আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই আলোচনা থেকে কেউই বড় কোনো অগ্রগতি আশা করছে না, আবার হাল ছাড়তেও রাজি নয় কোনো পক্ষ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন একসময় বলেছিলেন, ব্রেক্সিট পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ব্রিটেন নিজের পিঠা নিজেই পুরোটা খেতে পারবে। কিন্তু এখন আলোচনা যেভাবে চলছে তাতে মনে হচ্ছে না ২৭ জাতি জোট ইইউ ব্রিটেনকে পিঠার অর্ধেকটাও দিতে রাজি। ৪৫ কোটি জনগণ অধ্যুষিত ইইউ বিশ্বের সর্ববৃহত্ মুক্তবাজার অঞ্চল, কাজেই ব্রিটেন এই সুযোগপুরোটা হাতছাড়া করতে চাইছে না। অন্যদিকে ইইউর জটিল নিয়ম কানুনগুলো অনুসরণ করাও দেশটির জন্য সহজ ছিল না। এটি ব্রিটেনের ইইউ ছাড়ার অন্যতম কারণ।
প্রশ্ন হলো ব্রেক্সিট কি কেবল ইউরোপের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। ব্রেক্সিট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এবং তাতে অগ্রগতি না হওয়ার খবর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছে না ঠিকই তবে বিশ্ববাণিজ্যের ওপর এর যথেষ্ট প্রভাব পড়বে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। যেমন নো ডিল ব্রেক্সিট হলে অর্থাত্ কোনো বাণিজ্য চুক্তি ছাড়াই ৩১ ডিসেম্বরের সময়সীমা পার হয়ে গেলে ব্রিটিশ অর্থনীতি আগামী এক দশকে ৪ শতাংশ সংকুচিত হবে। কারণ এ সময় ব্রিটেন ও ইইউর মধ্যে কোনো বাণিজ্যনীতি থাকবে না।
ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘসূত্রিতার কারণ মূলত শুল্ক। বিষয়টি নিয়ে দশকের পর দশক ধরে ইউরোপীয় বাণিজ্য মন্ত্রীদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা কাজ করেছে। এ দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা যখন হয়েছে শুল্ক ইস্যুতে অনেক সময় মতৈক্য ছাড়াই শেষ হয়েছে সেসব বৈঠক। পশ্চিমা মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা একটি স্বাভাবিক বিষয়। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কোম্পানিগুলো নিজ নিজ সরকারের কাছ থেকে শুল্ক ও অন্যান্য সুবিধা পেয়ে এসেছে। বিষয়টি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পক্ষে অনুকূল নয়। ফলে দেশগুলোর মধ্যে কখনো কখনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বিষয়টি চীন-মার্কিন বাণিজ্য বিরোধের সঙ্গে তুলনীয়। বর্তমানে ব্রিটেন ও ইইউর মধ্যে চলমান আলোচনায় ইউরোপের দেশগুলোর আশঙ্কা অধিকতর বিনিয়োগ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্রিটেন তাদের কোম্পানিগুলোকে নিয়ে যেতে পারে।
২০১৮ সালে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ব্রেক্সিট আলোচনার জন্য কিছু মূলনীতি ঠিক করে দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল ভবিষ্যতের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সমতা ভিত্তিক, কোনো পক্ষ অন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ নেবে না। ব্রেক্সিট উত্তরকালে যুক্তরাজ্য যেন ভর্তুকি, কর বা অন্য কোনো ধরনের সুবিধা দিয়ে কোম্পানিগুলোকে অসম প্রতিযোগিতায় নিয়ে না আসে ঐ নির্দেশনায় তার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছিল। নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল শ্রমিকদের সুরক্ষা অথবা পরিবেশ বাঁচাতে যুক্তরাজ্য একতরফাভাবে কোনো মূলনীতি ঠিক করবে না। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে নির্দেশনা জারি করে যে, ক্রেতাসুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের মতো ইস্যুগুলোতে যুক্তরাজ্যকে ইইউর নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সঙ্গত কারণেই ব্রিটেনের জনসাধারণ এই নির্দেশনা পছন্দ করবে না। কারণ তারা ইইউর কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই ২০১৬ সালের গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে সায় দিয়েছিল। অর্থনীতি এবং অভিবাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পক্ষে ছিল জনগণ। এখন ইউরোপিয়ান কমিশনের সিদ্ধান্ত মেনে নিলে বেক্সিটের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে। ইইউর সাফ কথা—অভিন্ন বাজারের সুবিধা ভোগ করতে হলে তাদের নির্দেশনা যুক্তরাজ্যকে মানতে হবে। ব্রিটেনের প্রধান ব্রেক্সিট আলোচক ডেভিড ফ্রস্ট এ বছর আরো প্রথম দিকে বলেছিলেন, ‘আলোচনার জন্য আমরা সুবিধাজনক স্থানে নেই, আমাদের প্রচণ্ড চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।’ যুক্তরাজ্য চায়, জাপান, কানাডা বা অন্যান্য দেশের মতো আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিতে ইইউ রাজি হোক। কিন্তু ইইউ তাতে রাজি নয়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে—বিচ্ছেদের পর ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসের ভূমিকা কী হবে। চুক্তি না হলে নতুন করে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ এবং দুই তরফে কর আরোপ শুরু হবে। এদিকে ফ্রান্সের প্রত্যাশা ব্রিটিশ জলসীমায় মাছ ধরার সুযোগ অবারিত থাকুক। বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি।
