২০১১ সালের আগ পর্যন্ত সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্য চমত্কার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু আরব বসন্ত তাদের মধ্যে বৈরিতার সূচনা করে। আরব বসন্তে তুরস্কের সমর্থন ছিল গণতন্ত্রপন্থিদের প্রতি। অন্যদিকে সৌদি রাজপরিবারের সমর্থন ছিল একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের প্রতি। তার পর অনেক সময় গড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রেই কেবল দেশ দুটির মধ্য মতপার্থক্য ছিল না, এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যতগুলো বিষয় সামনে এসেছে, সবগুলোতে দেশ দুটির অবস্থান ছিল বিপরীতমুখী। ২০১৬ সালে নিজের বিরুদ্ধে একটি সেনা অভ্যত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়ার পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান কার্যত এক নবজীবন লাভ করেন। বৈশ্বিক রাজনীতিতে তুরস্কের এক নতুন খেলোয়াড় হিসেবে নব উত্থান হয়। অনেক বিশ্লেষক বলতে শুরু করেছেন, উচ্চাভিলাষী এরদোয়ান মূলত অটোমান শাসনামলের জৌলুশ, প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছেন। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ককেসাসে তুরস্কের সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
২০১৭ সালে উপসাগরীয় জোট এবং মিশর মিলে কাতারের ওপর যে অবরোধ আরোপ করে, সেখানে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তুরস্ক ও ইরান। এতে একদিকে যেমন তুরস্ক ও ইরানকে কাছাকাছি করেছে, আবার একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গেও কাতারের মৈত্রিতা হয়। ইরান ও তুরস্কের সহযোগিতায় কাতার শুধু অবরোধকে রুখে দেয়নি বরং কাতার অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। সৌদি আরব তার নিরাপত্তার জন্য ইরানকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর কট্টর ইরান বিরোধী নীতি গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে ছয়-জাতির সঙ্গে ইরানের সম্পাদিত চুক্তি থেকে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন। যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল এবার হয়তো ইরানকে বশে আনা যাবে। অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে কিছুটা কাবু করা সম্ভব হলেও দমিয়ে রাখা যায়নি। ইয়মেন, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন—সব জায়গাতেই ইরানের সফলতা এসেছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের তিক্ততা চরমে উঠে, যখন ইস্তান্বুলের সৌদি আরবের দূতাবাসে রাষ্ট্রীয় মদতে সাংবাদিক জামাল খাসগিকে হত্যা করা হয়। তুরস্ক প্রথম থেকে সৌদি রাজপরিবারকেই হামলার জন্য দায়ী করে আসছিল।
লিবিয়া, সিরিয়া, পূর্ব-ভূমধ্যসাগর সর্বশেষ আজারবাইজানেও তুরস্কেরই জয় হলো। কয়েক মাস আগে ফিলিস্তিনি নেতাদের নিয়ে আঙ্কারায় একাধিক বৈঠকের আয়োজন করে তুরস্ক। ২০০৬ সাল থেকে হামাস ও ফাতাহর মধ্যে চলমান বিরোধ মিটিয়ে একটা সাধারণ নির্বাচনে বিষয়ে উভয় দলকে রাজি করাতে সক্ষম হয়। এক সময়ের সৌদি আরবের ঘনিষ্ট মিত্র পাকিস্তান এবং ইন্দোনেশিয়াকে সঙ্গে নিয়ে একধরনের মৈত্রীতে গেছে তুরস্ক। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও যথেষ্ট তত্পরতা দেখা যাচ্ছে তুরস্কের।
যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন আনবে। জো বাইডেন নির্বাচনের আগে একাধিকবার বলেছেন, জামাল খাসোগি হত্যার জন্য সৌদি আরবকে শাস্তি পেতে হবে। এ ছাড়া ইয়েমেনে সৌদি আরবের নৃশংসতার বিপক্ষেও সরব তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে ফেরার ঘোষণা দিয়েছে। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শেষে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেবে—এটা না বলা গেলেও, এটা নিশ্চিত যে যুবরাজ সালমান ডোনাল্ড ট্রাম্পের থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছেন, সেটা বাইডেন থেকে পাবেন না। আবার একই সঙ্গে সৌদি আরবের চিরশত্রু ইরানের ওপর থেকে নিষোধাজ্ঞা উঠে গেলে ইরান আরো শক্তিশালী হবে। সব মিলিয়ে সৌদি আরবের রাজপরিবারের জন্য আগামী দিনগুলো একটু চ্যালেঞ্জিং হবে—এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
গত ২০ নভেম্বর সৌদি বাদশা সালমান তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েফ এরদোয়ানকে ফোন করেন। তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্য বৈরিতা দূর করতে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। নাইজারে সদ্য সমাপ্ত ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগদানের ফাঁকে, সাইড বৈঠকে তুরস্ক ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এই দুটি ঘটনা এটাই প্রমাণ করে, দেশ দুটি সম্পর্ক স্বাভাবিককরণে আগ্রহী। আর এই আগ্রহটা প্রথম এসেছে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে। সৌদি আরব কি তাহলে তুরস্কের উত্থান মেনে নিচ্ছে?
n লেখক :শিক্ষার্থী, আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের ওপর স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
