ফুলবাড়িয়া মার্কেটের ‘অবৈধ’ দোকান মালিকানা নিয়ে বিতর্ক

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:১৬

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ফুলবাড়িয়া মার্কেটের ৯১১টি দোকান উচ্ছেদ নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। বর্তমান মেয়র এসব দোকানকে অবৈধ বললেও সাবেক মেয়র বলছেন এসব বৈধ। আর এদিকে ৯১১টি দোকানের মালিক দোকান হারিয়ে হয়ে পড়েছেন কর্মহীন। তাদের দাবি, দোকান কেনা ও বৈধ করার জন্য কোটি কোটি টাকা দিয়েছেন সিটি করপোরেশন ও মার্কেট কমিটির নেতৃবৃন্দকে। কিন্তু এখন সেই টাকা ও ব্যক্তির হদিস পাচ্ছেন না তারা। এমনকি ২০১৯ সাল পর্যন্ত সিটি করপোরেশন তাদের কাছ থেকে দোকান ভাড়া আদায় করেছে। অন্যদিকে বর্তমান সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব দোকান পুরোপুরি অবৈধভাবে বানানো হয়েছে। তাই উচ্ছেদ করা হচ্ছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিটি করপোরেশনের নকশার বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে দীর্ঘদিন ধরে মার্কেট কমিটির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলু গড়ে তোলেন ৯ শতাধিক দোকান। যেগুলো বাথরুম, বাথরুমের সামনের খোলা জায়গা, লিফটের জায়গা, ফ্লোর স্পেস, বারান্দা, বেজমেন্ট, ক্রেতাদের হাঁটা-চলার জন্য রাখা খোলা জায়গা দখল করে বানানো হয়েছে। প্রতিটি দোকান ২০ থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। তবে এই দোকান বিক্রিই শুধু নয়, বিভিন্ন সময় বৈধ করার জন্য টাকাও নিয়েছেন তিনি।

মিসবাহ উদ্দীন নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি দেলোয়ার হোসেন দেলুর কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে দুটি দোকান কিনেন। কিন্তু ২০১৯ সালের দিকে এসে সিটি করপোরেশন অবৈধ সব দোকানে তালা লাগিয়ে দেয়। পরে দেলোয়ার হোসেন দেলু সিটি করপোরেশন থেকে এসব বৈধ করার কথা বলে শাটারভেদে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেন। এ সময় টাকা লেনদেনের সময় তত্কালীন মেয়রের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানান।

তিনি আরো জানান, মেয়র এসব অবৈধ দোকান বৈধ করার বিষয়ে তখন তাদের আশ্বাসও দেন। এরপরে সিটি করপোরেশন গত বছর ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সালের ভাড়াও আদায় করে। সে টাকা আদায়ের রশিদও তাদের কাছে রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, তত্কালীন ডিএসসিসির রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার ডিএসসিসির এই মার্কেটসহ সব মার্কেটের অবৈধ দোকান নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার মাধ্যমেই সিটি করপোরেশনে এসব দোকানের টাকা এসেছে। পরবর্তীকালে বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পরেই তাকে তার দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করেন। পরে তার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে পড়ার পর তা আমলে নিয়ে কমিশন তাকে তলবি নোটিশ পাঠায়।’

ইউসুফ আলী সরদার দুদকের জালে থাকলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। বর্তমান মার্কেট কমিটির সভাপতি মূল হোতা দেলোয়ার হোসেন দেলু। ক্যাসিনো কাণ্ডে তার নাম আসার পরেই তিনি বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন বলে জানা যায়।

এদিকে এসব দোকানকে বৈধ বলছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি এই উচ্ছেদ অভিযান অবৈধ বলে দাবি করছেন। সাঈদ খোকন দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, বোর্ড সভার মাধ্যমে আমরা এসব দোকানকে বৈধতা দিয়েছি। দেলোয়ার হোসেন দেলুর দোকান বিক্রি ও বৈধ করার কথা বলে নেওয়া টাকা সিটি করপোরেশন পেয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সিটি করোপরেশেন ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভাড়া আদায় করেছে। সব কিছু বিবেচনা করেই এসব বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সব কিছুর কাগজপত্র আছে।

এ বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার ফোন দিলেও সাবেক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদারকে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে সিটি করপোরেশন ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ভাড়ার বিষয়ে  ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, নকশাবহির্ভূত এসব দোকানের মধ্যে কিছু সাময়িক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বরাদ্দের শর্তে উল্লেখ করা হয়েছিল, করপোরেশন চাইলে যে কোনো সময় এসব দোকান উচ্ছেদ করতে পারবে। তবে বরাদ্দ ছাড়াও ফুটপাতে এবং মানুষের হাঁটার জায়গায় অনেক দোকান গড়ে উঠেছে। তাই এসব উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, এসব দোকান অবৈধ। যারা অবৈধভাবে দখল করে দোকান তুলেছেন তারা কাকে টাকা দিয়েছেন সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। যাদের অনুমোদন আছে তারাই এখানে ব্যবসা করবেন। আমরা সেটি নিশ্চিত করব। পর্যায়ক্রমে আমরা সিটি করপোরেশনের সব মার্কেট থেকে অবৈধভাবে গড়ে তোলা সব দোকান উচ্ছেদ করব।