করোনার টিকা

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:০৯

করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত বিশ্ব। এখন পর্যন্ত ৭ কোটি ২১ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু বরণ করেছে ১৬ লাখেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অব্যাহতভাবে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। এবারের শীতকাল অনেক দেশের ইতিহাসে এক অন্ধাকার সময় হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

ইতিমধ্যে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় তিনটি টিকা খুবই কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ফাইজারের সঙ্গে জার্মান কোম্পানি বায়োএনটেক যে টিকার উদ্ভাবন করেছে তা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরবসহ বিশ্বের অনেক দেশ এই টিকা প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। গত সপ্তাহেই টিকা প্রয়োগ শুরু করেছে ব্রিটেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার শুক্রবার (১১ ডিসেম্বর) এই টিকা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। আজ সোমবার রাজ্যে রাজ্যে এই টিকা পৌঁছে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, কয়েকটি ধাপে এই টিকার প্রয়োগ হবে। শুরুতে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রথমসারির কর্মীদের দেওয়া হবে।

আরেক মার্কিন কোম্পানি মডার্নার ভ্যাকসিনও ৯৫ শতাংশ কার্যকর বলে দাবি করা হয়েছে। শিগগিরই তারা কয়েকটি দেশে প্রয়োগের অনুমতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া অক্সফোর্ডের টিকা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও তারা এখনো অনুমোদনের জন্য আবেদন করেনি। এছাড়া চীনের সিনোভ্যাক কয়েকটি দেশে চালানো পরীক্ষায় কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফাইজার ও মডার্নার মতো কোম্পানির টিকা অনুমোদন পাওয়ার আগেই অগ্রীম কিনে রেখেছে অনেক দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটি বলছে, এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ৬৪০ কোটি ডোজ আগাম বিক্রি হয়ে গেছে। আর এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে ধনী দেশগুলো।

আর পড়ুনঃ ব্রেক্সিট-উত্তর চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা

লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকসের হেলথ পলিসির অধ্যাপক ক্লেয়ার ওয়েনহামের মতে, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে আগাম ওষুধ কেনার প্রচলন আগে থেকেই রয়েছে। যাতে করে তারা পণ্য উত্পাদনে তহবিল জোগাড় করতে পারে। এক্ষেত্রে যারা বেশি অর্থ শুরু দেয় পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রথমসারিতে থাকে। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, টিকার জন্য এসব ওষুধ কোম্পানিতে সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছে উচ্চ-আয়ের ধনী দেশগুলো। মধ্যম আয়ের কিছু দেশও উত্পাদন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে টিকা কেনার চুক্তি করতে পেরেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত ও কানাডা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ডোজ পেতে চুক্তি করেছে।

সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, বর্তমান অবস্থায় শুধু ধনী দেশগুলো এই টিকা কিনতে সক্ষম। এই মহামারি বিশ্বকে বিভক্ত করবে। সেটা হলো ধনী আর গরিব দেশ। গত কয়েক মাস ধরেই ধনী দেশগুলো উত্সবের সঙ্গে করোনার টিকা কিনেছে। কিছু দেশ ও আঞ্চলিক জোট এত পরিমাণ টিকার ডোজের আগাম অর্ডার দিয়েছে, যা তাদের জনসংখ্যার প্রয়োজনের চেয়ে তিন গুণ বেশি। কানাডার সরকার যে পরিমাণ আগাম অর্ডার দিয়ে রেখেছে, তা তার জনগণের চেয়ে পাঁচ-ছয় গুণ বেশি।

ডিউক এনালাইসিসের আন্দ্রিয়া টেইলর বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ধনী দেশগুলো টিকা পাবে আর গরিব দেশগুলোর পাওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরিব দেশগুলোর টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করছে কী পরিমাণ টিকা আবিষ্কার হবে এবং কত দ্রুত তারা উত্পাদন করতে পারবে তার ওপর। ফাইজার আশা করছে, চলতি বছরে ৫ কোটি ডোজ এবং ২০২১ সালে ১৩০ কোটি ডোজ উত্পাদন করবে। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য দুই ডোজ লাগবে। এই হিসাব করলে বোঝা যাবে টিকা কোথায় যাবে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, ধনী দেশগুলো যে পরিমাণ টিকা আগাম কিনেছে তাতে প্রায় ৭০টি গরিব দেশের পক্ষে ২০২১ সালে মাত্র ১০ জনের মধ্যে ১ জনকে টিকা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। মডার্নার ভ্যাকসিন ঠান্ডা অবস্থায় রাখতে হবে। এটি অনেক গরিব দেশের জন্য চ্যালেঞ্জের হবে। বিশেষ করে, যেসব দেশে গরম বেশি এবং বিদ্যুতের সক্ষমতা কম।

আরো পড়ুনঃ ট্রাম্পের ব্যর্থ অভ্যুত্থান!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, এটি সহজেই বোধগম্য যে, প্রতিটি দেশের সরকার তাদের জনগণকে সবার আগে রক্ষার চেষ্টা করবে। তবে এই বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলায় অবশ্যই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ আমরা তখনই নিরাপদ হবো যখন সবাই নিরাপদ হবে। বৈশ্বিক ভ্যাকসিন পরিকল্পনা ‘কোভ্যাক্স’ করোনার টিকার সম বণ্টনের জন্য কাজ করছে। তারা অনেক কোম্পানির সঙ্গে টিকা কেনার চুক্তি করেছে। তবে ফাইজার কোভ্যাক্সের সঙ্গে কোনো চুক্তি করেনি। ইউনিভার্সিটি অব কেপ টাউনের অধ্যাপক গ্রেগরি হাসি সিএনএনকে বলেন, বৈশ্বিকভাবে টিকার সমতা বিধানের কথা বলা হলেও জাতীয়তাকরণ স্পষ্ট। যা খুবই হতাশাজনক। আমাদেরকে এই মুহূর্তে বৈশ্বিক সংহতি এবং সহযোগিতা নিয়ে কথা বলতে হবে। কিছু নির্দিষ্ট দেশ শুধু টিকা পাবে আর অনেক দেশ পাবেই না এটা কোনো নৈতিকতা হতে পারে না। অবশ্যই টিকার ক্ষেত্রে সমতা বিধান করতে হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি