আমাদের জন্য দ্বিতীয় পৃথিবী নাই!

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:০৬

 ‘জলবায়ু তো পরিবর্তন হইবারই বিষয়! ইহাতে বিস্ময়ের কী আছে! যুগ যুগ ধরিয়াই তো পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন হইয়া আসিতেছে’—বিশ্বের অনেক নেতাই এমনটি মনে করিয়া থাকেন। বিজ্ঞানীদের মতে, যাহারা জলবায়ুর পরিবর্তন লইয়া এইভাবে চিন্তা করেন, তাহারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নন। নিশ্চয়ই পৃথিবীতে বরফ যুগ, উষ্ণ যুগ, বিবিধ প্রাকৃতিক পরিবর্তন অযুত-লক্ষ-নিযুত বত্সর ধরিয়া ঘটিয়া আসিতেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন হইয়াছে অত্যন্ত ধীরে, হাজার হাজার বত্সর ধরিয়া। অপরদিকে আঠারো শতকে শিল্পবিপ্লবের পর মাত্র কয়েক শতাব্দীতেই পৃথিবীর তাপমাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। ইহার কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই পরিবর্তন পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে ঘটিতে সময় লাগিত হাজার হাজার বত্সর। এই জন্য ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বলা হইয়াছিল—২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের সকল দেশকে ‘ন্যাশনাল ক্লাইমেট অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরির কাজ শেষ করিতে হইবে। ‘ক্লাইমেট অ্যাম্বিশন সামিট’-এ গত শনিবার জলবায়ু পরিবর্তনে জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য বিশ্বের সকল দেশের সরকারপ্রধানদের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরিয়া রাখিতে বিভিন্ন দেশের বর্তমান প্রতিশ্রুতিসমূহ পর্যাপ্ত নহে। পথ পরিবর্তন না করিলে আমরা চলতি শতকেই গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি দেখিব—যাহার পরিণতি হইবে ভয়াবহ। বায়ুমণ্ডলে কার্বন জমা পড়ার হার শূন্যে নামাইয়া আনিবার (কার্বন নিউট্রালিটি) লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া অবধি এই জরুরি অবস্থা অব্যাহত রাখিবার কথা বলেন তিনি।

এখন প্রশ্ন হইল, বায়ুমণ্ডলে কার্বন জমা পড়ার হার শূন্যে নামাইয়া আনা কি প্রায় অসম্ভব কাজ নহে? শিল্পবিপ্লবকে কি শাটডাউন করা সম্ভব? বলা যায়, আধুনিক অতি উন্নত জীবনযাপন ও সভ্যতার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য গড়িয়া উঠিয়াছে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরিয়াই। সুতরাং চাহিলেই শিল্পকারখানা-সৃষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসারণ বন্ধ করা সম্ভব নহে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি হইতে বাহির হইয়া গিয়াছিলেন। তবে আশার কথা হইল—নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইতিমধ্যে জানাইয়াছেন, তিনি আমেরিকাকে পুনরায় প্যারিস চুক্তির সহিত যুক্ত করিবেন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিশ্বে বাংলাদেশ সর্ববৃহত্ ডেল্টা। এই কারণে জলবায়ু সম্মেলন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পূর্বাভাস অনুযায়ী জলবায়ুর বিরূপ দশা ঘটিলে আমরাই সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হইব। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ ঝুঁকিতে রহিয়াছে। এই ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় বলিয়াছেন—এই বত্সর বন্যায় বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ ডুবিয়া গিয়াছিল; এক দশকের রেকর্ড ভঙ্গকারী ভারী বর্ষণ হইয়াছে।

আমরা ইতিপূর্বে বলিয়াছি যে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে লইয়া যাইতেছে এই মানবসভ্যতাকে। ইহার বিবিধ নিদর্শন এখন ঘনঘন দেখা যাইতেছে। বিশ্বব্যাপী আমরা দেখিতে পাইতেছি তুষারপাত, শীত ও গরমের চরম অবস্থা, বিস্তীর্ণ ও প্রলম্বিত বন্যা, বিধ্বংসী দাবানলের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব। বিশেষজ্ঞরা একমত যে অরণ্য ধ্বংস এবং প্রাণিজগত্ ও মানুষের মধ্যে ব্যবধানটি ক্রমশ সংকুচিত হইবার ফলেই প্রাণীদের রোগ স্থানান্তরিত হইতেছে মানুষের দেহে, যাহার পরিণতিতে বৈশ্বিক মহামারি এখন নিষ্ঠুর বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন লইয়া ইতিপূর্বে বান কি-মুন একটি তাত্পর্যপূর্ণ কথা বলিয়াছিলেন। তাহার মতে, ‘প্ল্যান বি’ বলিয়া এই সমস্যার দ্বিতীয় কোনো সমাধান নাই। কারণ, আমাদের ‘প্ল্যানেট বি’ নাই। আমাদের যেহেতু দ্বিতীয় আরেকটি পৃথিবী নাই, কার্বন নিঃসারণ কমাইতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যতীত আর কোনো উপায়ও নাই। এই সত্য না মানিয়া উপায় কী?