তীব্র ঠান্ডা পড়েছে। কষ্টের সীমা নেই। জনজীবন প্রায় স্তব্ধ। তার ওপর রয়েছে জ্বর, কাশি, সর্দির ভয়, রয়েছে করোনা-১৯-এর ভয়। এরই মধ্যে এসে পড়েছে আমাদের বাঙালি জাতির মহান বিজয় দিবস। ১৬ই ডিসেম্বর। এবার শুধু বিজয় দিবস উদ্যাপন নয়, মুজিববর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে। আবার আসছে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি দিবস। স্মরণীয় ও বরণীয় দিবস। এবার বিজয় দিবসের দিনই শুরু হবে পৌষ মাসে অর্থাত্ শুরু হবে শীতকাল, তার পরই বসন্ত। কৃষকরা ঘরে আমন ধান তুলছেন। আমন মানে ‘অগ্রহায়ণী’। ভালো ফসল হয়েছে। কৃষকরা খুশি। কিন্তু কুয়াশা থাকলে তবে বিপদ। ধান শুকানোতে সমস্যা হবে। এসব কথা ভাবছি আর মনে পড়ছে ১৯৭১ সালের কথা। ঐ বছরের বিজয় উত্সবের কথা। আমি তখন ঢাকায় ছিলাম না। ঢাকায় ফিরেছি জানুয়ারির ১০ তারিখে যেদিন বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন বীরের বেশে। ঢাকায় এক দিন থেকে চলে যাই দেশের বাড়িতে। রাস্তাঘাট ভাঙা, পুল ব্রিজ ভাঙা। রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কিছুটা নড়বড়ে বাসে, কিছুটা রিকশায়, কিছুটা হেঁটে বাড়ি পৌঁছি কিশোরগঞ্জের গ্রামে। সবার আনন্দ ধরে না। ৯ মাস পর পুনরায় দেখা। কেউ ভাবেনি আবার এক জনের সঙ্গে আরেক জনের দেখা হবে। ৯ মাস কেউ শান্তিতে থাকতে পারেনি। প্রাণের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে—এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। মহিলাদের চরম দুর্দিন গেছে, যুবক-যুবতিদের দুর্দিন গেছে। কৃষক মাঠে ফসল ফলাতে পারেননি। মিল ফ্যাক্টরি ছিল বন্ধ। অফিস-আদালত চলেনি। বাজার-দোকানে মাল নেই। মালের সরবরাহ নেই। অভাব সর্বত্র। বহু ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, অনেকের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী। আমার বাড়িঘর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশীরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। তবু মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। আত্মীয়স্বজন ‘ক্যাশ’ চায়। তারা অভাবে। প্রতিবেশীদের ক্যাশ নেই। প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব বাজারে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে সবকিছু লন্ডভন্ড। আমি এই অবস্থার মধ্যেই ঢাকায় ফিরি। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব শেষ করে জগন্নাথ কলেজের শিক্ষক, কিছুদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৯ মাসের বেতন পাই। ভালো টাকা কিন্তু নগদে পঞ্চাশ শতাংশ, সঞ্চয়পত্রে ৫০ শতাংশ। অথচ প্রয়োজন অনেক বেশি। অন্তত একখানা ঘর তো বাড়িতে তুলতে হবে। জীবন সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। বিছানাপত্র, খাটপালং সবই হবে নতুন। শুধু আমার নয়, অনেকেরই। কীভাবে আত্মীয়দের পড়শিদের সাহায্য করা যায় তার চিন্তাও মাথায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতি মুহূর্তে নিজেকে কর্তব্যপরায়ণ হতে তাড়া দিচ্ছে। কর্তব্য পালনে ক্যাশ দরকার। এই সময় আমার ব্যাংকে গেলাম, সদরঘাট অগ্রণী ব্যাংকে। ম্যানেজারকে বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, সাদা কাগজে দরখাস্ত করতে লোনের জন্য। বঙ্গবন্ধুর সরকার পুনর্বাসন, পুনর্গঠনের জন্য দরখাস্তের ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে ঋণ দিচ্ছে। আমিও পেলাম ৫ হাজার টাকা। এটা পরিশোধ করেছি মাসে ১০০ টাকা করে কিস্তি দিয়ে। এই টাকা থেকে আত্মীয়দের যত্সামান্য সাহায্য করেছি। তখন ক্যাশ মহামূল্যবান বস্তু। জামাকাপড়, জুতা, মোজা, চাদর, প্যান্ট-সার্ট মহামূল্যবান বস্তু। এসবের অভাব।
কী মনে হয় আজকে? ‘করোনা-১৯’ আক্রান্ত বাংলাদেশে। কী, এখন তাই মনে হয় না? ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছি চেনা শত্রু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। এবারের যুদ্ধ অচেনা শত্রু করোনা-১৯-এর বিরুদ্ধে। এটা এমন এক রোগ, যাতে কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারে না। মানুষ থেকে সহজে তা ছড়ায়। বন্ধু, আত্মীয়স্বজন মারা গেলে, হাসপাতালে গেলে তাদের দেখতে যাওয়া যায় না। মানুষের হাতে ক্যাশ নেই। অনেকে চাকরিচ্যুত, ব্যবসায়চ্যুত, মজুরিহীন। জনজীবন এখনো স্বাভাবিক হয়নি। কলেজ, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বন্ধ। এখনো ‘মাস্ক’ পরতে হচ্ছে। হাত ধুতে হচ্ছে, দূরত্ব রক্ষা করে চলতে হচ্ছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। সবাই আতঙ্কে। এদিকে যাদের কিছু সঞ্চয় ছিল সব ভেঙে তারা খেয়েছে। হাতের কাছে কিছু নেই। জমিজমা বন্ধক দিচ্ছে যাদের তা আছে। গ্রামে একশ্রেণির লোকের হাতে রেমিট্যান্সের টাকাসহ নানা রোজগারের টাকা আছে। তারা মহাজনি কাজ করছে। চারদিকে আজ শুধু টাকা চায়, ক্যাশ চায়। অগ্রিম বেতন-মজুরি চায়। আশঙ্কা, অনিশ্চয়তার কোনো শেষ নেই। কবে টাকা আসবে, টাকা মানুষ পাবে কি না, তা নিয়ে চলছে অনিশ্চয়তা। সরকার সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নতুন করে আক্রান্ত।
সরকার কি পারে না এমতাবস্থায় ক্যাশের ব্যবস্থা করতে। সাহায্য/অনুদান হিসেবে দিতে সরকারের অসুবিধা হলে ঋণ হিসেবে তো দেওয়া যায়। যাদের টাকার দরকার তারা ব্যাংকে দরখাস্ত করুক। দেখে দেখে ঋণ দেওয়া হোক। জামানত চাওয়া যাবে না। বড় বড় গ্রাহককে যদি পার্সোন্যাল গ্যারান্টি, করপোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ দেওয়া যায় তাহলে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত লোকদের ঋণ দেওয়া যাবে না কেন? ঋণের ওপর সুদ হবে সামান্য। সরকার ব্যাংককে ব্যবসায়ীদের যেমন ভর্তুকি দিচ্ছে, এক্ষেত্রেও তা-ই দেবে। কিস্তি হবে সহজতর, যাতে মানুষ তা পরিশোধ করতে পারে। ‘মরেটোরিয়াম’ও দরকার। কারণ মানুষের রোজগারের পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আমার প্রস্তাব কি খুব বড় কিছু? আমি মনে করি না। তবে একটা অসুবিধা দেখা দিচ্ছে মনে হয়। সরকারঘোষিত প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে খুবই ধীরে ধীরে। কৃষক শ্রেণির লোক; ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী/ফ্যাক্টরির মালিকরা ঋণের টাকা পাচ্ছেন না। এই সম্পর্কে দৈনিক ইত্তেফাকে বিস্তারিত রিপোর্ট মাঝেমধ্যেই ছাপা হচ্ছে। সরকারের প্রণোদনা কর্মসূচিটি যে ব্যাংকের ঋণনির্ভর, সেই সম্পর্কেও ইত্তেফাকে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে ব্যাংকের ওপর কাজের চাপ অনেক বেড়েছে। এতে ভুগছে শিল্প ও ব্যবসায়। ভুগছে রপ্তানি-ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। আমার ধারণা, আজ যদি বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংক থাকত, তাহলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। আমরা জানি বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতার পর দুটো ব্যাংকের জন্ম দেয়। এ দুটো ব্যাংক হচ্ছে—বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) এবং বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা (বিএসআরএস)। এরা শিল্পঋণ জোগাত। তাদের দক্ষতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কার পরামর্শে জানি না দুটো ব্যাংক তুলে দিয়ে একটা বাণিজ্যিক ব্যাংক তৈরি করা হয়েছে, যার নাম বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)। এটা শিল্প ব্যাংক নয়, বাণিজ্যিক ব্যাংক। এদিকে ছোট ও মাঝারি ধরনের শিল্পে ঋণ জোগানের জন্য তৈরি করা হয়েছিল ‘বেসিক ব্যাংক লিমিটেড’। এর নামেই ছিল ছোট ঋণের কথা। এটিও তুলে দিয়ে একে বানানো হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। অনিয়ম-দুর্নীতি করে এই বাণিজ্যিক ব্যাংকটির সর্বনাশ করা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে দেশে শিল্পায়নের অর্থ জোগান দিতে পারে এমন কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আর নেই। এখন শিল্পঋণ জোগান দিচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। এটি যে কত গর্হিত কাজ তা বর্তমান অর্থমন্ত্রী বারবার বলছেন। তিনি অর্থমন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর বহুবার বলেছেন, ছোট ছোট স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া উচিত নয়। বিদেশে শিল্পের জন্য টাকা আসে স্টকমার্কেট থেকে। কিন্তু আমাদের এখানে টাকা আসছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। এসব ব্যাংকে লোকেরা তিন মাস-ছয় মাসের জন্য মেয়াদি আমানত রাখে। রয়েছে সঞ্চয়ী আমানত যার টাকা যখন ইচ্ছা তখন তুলে নেওয়া যায়। এমন দেনার (ডিপোজিট) বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণ (অ্যাসেট) দেওয়া ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ, তা দেওয়া অনুচিত। ‘অ্যাসেট-লায়াবিলিটি’ ম্যাচিং বা সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ রয়েছে। সেটি বর্তমান সময়ে দারুণভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। এর ফলাফল কী মারাত্মক তা ব্যাংকের ভেতরে যারা কাজ করেন তারা জানেন। ব্যাংকের যত অনিয়ম, বড় বড় অনিয়ম তার বিরাট অংশ সাধিত হয় শিল্পঋণের মাধ্যমে। ১০০ টাকার যন্ত্রপাতি চীন থেকে ২০০-৩০০ টাকায় আনা হয়। ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের পরিস্থিতি মারাত্মক। এভাবে দেশ থেকে টাকা পাচার করা হচ্ছে। বিষয়টি অর্থমন্ত্রী অনুধাবন করে তা বন্ধের উদ্দেশ্যে জরিমানার ব্যবস্থা করেছেন। ব্যাংকগুলোতে ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের ব্যাপারে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণের একটা ভালো অংশ শিল্পঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কথা সবাই জানে। অথচ আগে এসবের বোঝা পড়ত বিশেষায়িত ব্যাংকের ওপর। তারা তা মোকাবিলা করার জন্য একধরনের দক্ষতা অর্জন করেছিল। কিন্তু খেলাপি ঋণের কথা বলে এসব শিল্পঋণের ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেখা যাচ্ছে সেই সমস্যা এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঘাড়ে চেপেছে। তারা বদনামি হচ্ছে। আমানতকারীরা ঝুঁকিতে পড়ছেন। নতুনভাবে ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করছে ব্যাংকগুলো। ফলে সরকারের প্রণোদনা কর্মসূচি পড়েছে গাড্ডায়। এমতাবস্থায় আমি যে ঋণের কথা বললাম তা দেবে কে? এই ভার কি নেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো? তারা কি নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত লোকদের জরুরি ঋণ দেবে? ক্যাশ দিয়ে তাদের বাঁচার ব্যবস্থা করবে? করা দরকার। কারণ বোঝাই যাচ্ছে, কোভিড-১৯ থেকে মুক্ত হতে আরো সময় লাগবে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে বিশ্বকে আরো অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে। এমতাবস্থায় ক্যাশ ছাড়া বাঁচার উপায় কী?
n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
