বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য জয়ের লড়াইয়ে নিয়োজিত একটি ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিপ্রধান দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ও শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। এদেশে মাত্র ৮৬ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমি থেকে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের অন্নসংস্থান হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন খোরপোষের কৃষি থেকে লাভজনক, উদ্বৃত্ত ও রপ্তানিযোগ্য কৃষিতে পদার্পণ করেছে। কৃষির এই উন্নতি টেকসই করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি উপকরণ শিল্প স্থাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষির প্রধান উপকরণসমূহ যেমন সার, বীজ, বালাইনাশক ও কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর বিদেশনির্ভরতা আমাদের উত্পাদনব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করতে পারে; যার নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র কৃষিতে পড়তে বাধ্য। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমিতে খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে হলে কৃষি উপকরণভিত্তিক স্থানীয় শিল্পের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কৃষিপ্রধান এই দেশে এখনো প্রধান প্রধান কৃষি উপকরণ উত্পাদনে দেশীয় শিল্প তেমন গড়ে ওঠেনি।
দেখা যায়, একমাত্র বালাইনাশক চাহিদার প্রায় শতভাগই বিদেশ থেকে আসে, যেখানে দেশীয় শিল্পের অবদান খুবই সামান্য। অথচ কৃষি উপকরণ শিল্পের মধ্যে পেস্টিসাইড বা বালাইনাশক শিল্প উল্লেখযোগ্য, যা ফসল উত্পাদন ও সংরক্ষণে অপরিহার্য। দেশে বর্তমানে চার শতাধিক কোম্পানি বালাইনাশক আমদানি ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিকটন বা কিলোলিটার, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। সাধারণত কোম্পানিগুলো সরাসরি মোড়কজাত বালাইনাশক আমদানি করে থাকে অথবা আমদানিকৃত বালাইনাশক দেশে মোড়কজাত করে বিক্রি করে থাকে। ফলে এক দিকে যেমন পণ্যের দাম বেড়ে যায়, অন্যদিকে অনেক সময় পণ্যের গুণমান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
অসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানাবিধ জটিলতায় দেশে স্থানীয় বালাইনাশক শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ২৩টি দেশীয় কোম্পানি বিদেশ থেকে বালাইনাশকের প্রায় ২০টি সক্রিয় উপাদান আমদানি করে নিজস্ব ফর্মুলেশন প্ল্যান্টে বালাইনাশক উত্পাদন করছে। এতে দেশের কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন বালাইনাশক নিশ্চিত করার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে বালাইনাশকের রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান নানাবিধ আইনকানুনের বেড়াজালে এসব স্থানীয় বালাইনাশক উত্পাদন শিল্পসমূহ গতিশীল হচ্ছে না।
স্বাধীনতা-উত্তর দেশের বালাইনাশক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘পেস্টিসাইড অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১’ এবং পরবর্তী সময়ে ‘বালাইনাশক বিধিমালা, ১৯৮৫’ প্রণয়ন করা হয়। এসব বিধিমালায় স্থানীয় পর্যায়ে বালাইনাশক উত্পাদন (ফর্মুলেশন) শিল্পসহায়ক কোনো নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত নেই, যা প্রকারান্তরে বিদেশনির্ভর কিংবা আমদানিনির্ভর বালাইনাশক শিল্পের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘বালাইনাশক বিধিমালা, ২০১৯’ প্রণয়নের কাজ চলছে। নতুন এই বিধিমালার খসড়ায়ও দেশে বালাইনাশক উত্পাদন শিল্পের জন্য কোনো নীতিগত সহায়তা রাখা হয়নি।
সাধারণত স্থানীয় বালাইনাশক উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ বালাইনাশকের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। বিদ্যমান আইনে একটি প্রতিষ্ঠান এসব উপাদান শুধু রেজিস্ট্রেশনে উল্লেখিত নির্দিষ্ট সোর্স বা উত্স থেকে আমদানি করতে বাধ্য থাকে। ফলে তারা অনেক সময় নিবন্ধিত উত্স থেকে উচ্চমূল্যে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হয়, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যা মোটেও যৌক্তিক কিংবা ব্যবসাবান্ধব নয়। এছাড়া কোনো কারণে যদি নিবন্ধিত বিদেশি উত্স কোম্পানির উত্পাদন বা সরবারহ বন্ধ থাকে, সেক্ষেত্রে উক্ত দেশীয় কোম্পানির কাঁচামাল আমদানিতে করণীয় সম্পর্কে আইনে সুস্পষ্টভাবে কিছু উল্লেখ নেই। তাই প্রস্তাবিত আইনে কাঁচামালের গুণমান ঠিক রেখে আমদানি উত্স উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঔষধশিল্পের জন্য বিদ্যমান অনুরূপ একটি আইন অনুসরণ করা যেতে পারে।
নিরাপদ খাদ্য উত্পাদনের জন্য বালাইনাশকের নিরাপদ ব্যবহার অপরিহার্য। দেশের অনেক বালাইনাশক কোম্পানি আইনগতভাবেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত অতি উচ্চমাত্রা (শ্রেণি-১এ), উচ্চমাত্রা (শ্রেণি-১বি) ও মাঝারি মাত্রার (শ্রেণি-২) বিষক্রিয়ার শ্রেণিভুক্ত বালাইনাশক আমদানি করে থাকে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক ব্যবহারে মাটি, পানি, বাতাস ও ফসলে বিষক্রিয়ার অবশিষ্টাংশ থাকার সুযোগ থাকে। এজাতীয় বালাইনাশকের আমদানি ও ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। অন্যদিকে জৈব বালাইনাশক কিংবা অপেক্ষাকৃত অধিক নিরাপদ শ্রেণিভুক্ত বালাইনাশকের স্থানীয় উত্পাদনে সরকারি নীতিগত সহযোগিতা অপরিহার্য। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বালাইনাশকের নাম শুনলেই আমরা শহুরে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কিন্তু কোনো দেশেই বালাইনাশক ছাড়া ফসল উত্পাদন হয় না, বরং অনেক উন্নত দেশে ফসলের জমিতে নিরাপদ পদ্ধতিতে অনেক বেশি পরিমাণ বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফসলের জমিতে হেক্টরপ্রতি বালাইনাশক ব্যবহারে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০তম। চীনে প্রতি হেক্টর ফসলের জমিতে গড়ে বালাইনাশক ব্যবহূত হয় প্রায় ১৩ কেজি। জাপান, ইসরাইল ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এর পরিমাণ প্রায় ১২ কেজি এবং নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ায় প্রায় আট কেজি। অন্যদিকে নানা উত্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর ফসলের জমিতে বালাইনাশক ব্যবহূত হয় দুই থেকে চার কেজি। আমাদের দেশে উন্মুক্ত চাষাবাদ পদ্ধতিতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্রমাগত একই ফসল চাষাবাদের কারণে বালাইয়ের প্রাচুর্য বেশি। তাই এখানে বালাইনাশক ছাড়া ফসল উত্পাদন প্রায় অসম্ভব। এটা সত্য যে অনিয়ন্ত্রিত বালাইনাশক ব্যবহারে পরিবেশ, মানবস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নিয়ম মেনে নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহারে এসব ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
দেশে প্রতি বছর বালাইনাশক আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় হয়। স্থানীয় বালাইনাশক উত্পাদনের মাধ্যমে যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। আবার বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এছাড়া দেশে উত্পাদিত বালাইনাশকসমূহের গুণমান সর্বদা মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। ফলে কৃষক মানসম্পন্ন বালাইনাশক দিয়ে কার্যকরভাবে বালাই দমন করতে পারবেন। দেশে উত্পাদনের ফলে ফসল সুরক্ষায় জরুরি আপত্কালীন বালাইনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। শুল্কমুক্ত রেয়াত সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামালের মাধ্যমে উত্পাদিত বালাইনাশকের উত্পাদন খরচ কম হবে বিধায় কৃষক সাশ্রয়ী মূল্যে বালাইনাশক ক্রয় করতে পারবে। এতে ফসলের উত্পাদন খরচ কমবে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া দেশীয় বালাইনাশক শিল্পের বিকাশে দেশে নতুন কর্মসস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উদ্ভূত করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিগত ২৬ মার্চ ২০২০ প্রদত্ত ভাষণে চাষযোগ্য প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল উত্পাদনের যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের বিষয়টি কত বড় চ্যালেঞ্জ তা আমরা অনুমান করতে পারি। তাই এ ধরনের সংকটে নিরবচ্ছিন্ন ফসল উত্পাদন অব্যাহত রাখতে দেশীয় কৃষি উপকরণ শিল্পসমূহ দেশের কৃষির জন্য অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে।
n লেখক :অধ্যাপক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
