নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন বিভিন্ন মহল। এমন প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ধর্ষণ, ধর্ষণ শেষে হত্যা, অপহরণের পর হত্যা মামলায় আদালত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করছে। বিভিন্ন মামলার রায়ে এর প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে। গতকালও দেশের তিন স্থানে এ সংক্রান্ত তিনটি মামলায় ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। চট্টগ্রামে ধর্ষণের পর দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশুকে হত্যার দায়ে আট আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। খাগড়াছড়িতে এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে তিন যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে চতুর্থ শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে অপহরণের পর গলা কেটে হত্যার দায়ে তিন জনকে মৃত্যুদণ্ড, তিন জনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বিভাগীয় অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, ২০১৮ সালে ধর্ষণের পর শিশু মীম হত্যা মামলায় আট আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক মো. জামিউল হায়দার এ রায় দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এম এ নাসের জানান, মীম হত্যা মামলায় আট আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড ও ১ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় সাত আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—মো. বেলাল হোসেন ওরফে বিজয় (১৮), মো. রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল (১৬), মো. হাছিবুল ইসলাম ওরফে লিটন (২৬), মো. আকসান মিয়া প্রকাশ হাসান (১৮), মো. সুজন (২০), মো. মেহেরাজ প্রকাশ টুটুল (৩২), আয়শা মমতাজ মহলের কেয়ারটেকার মনিরুল ইসলাম মনু (৪৯) ও শাহাদাত হোসেন সৈকত (১৯)। তাদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন সৈকত এখনো পলাতক।
২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি নগরের আকবরশাহ এলাকার আয়শা মমতাজ মহল নামের একটি ভবনে নিয়ে গিয়ে প্রথমে ধর্ষণ ও পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় ৯ বছর বয়সি শিশু ফাতেমা আক্তার মীমকে। আলোচিত এ মামলায় প্রত্যক্ষদর্শীসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে আদালত।
আকবরশাহ এলাকার ফাতেমাতুজ জোহরা হেফজুল কোরআন মহিলা মাদ্রাসার ২য় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল মীম। তার বাবা মো. জামাল উদ্দিন পেশায় একজন শ্রমিক। তাদের বাসা ছিল আকবরশাহ এলাকার কনকর্ড সি-ওয়ার্ল্ডের রাজা কাশেমের কলোনিতে। ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে আকবরশাহ বিশ্ব ব্যাংক কলোনির ছয় তলার একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির পাশ থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়িতে ধনিতা ত্রিপুরা নামের এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে তিন যুবককে মৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার দুপুরে খাগড়াছড়ি নারী ও শিশু দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মহা. আবু তাহেরের আদালত এ রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—রুমেন্দ্র ত্রিপুরা ওরফে রুমেন, ত্রিরন ত্রিপুরা ও কম্বল ত্রিপুরা। তবে তিন আসামির মধ্যে কম্বল ত্রিপুরা এখনো পলাতক রয়েছে।
খাগড়াছড়ির রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিধান কানুনগো জানান, ২০১৯ সালের ১৩ মে খাগড়াছড়ি সদরের ভাইবোনছড়ার বড়পাড়ার বাসিন্দা মন মোহন ত্রিপুরা ও স্বরলেখা ত্রিপুরা তাদের কিশোরী মেয়ে ধনিতা ত্রিপুরাকে (১৭) বাসায় রেখে দীঘিনালায় বেড়াতে যান। এই সুযোগে একই ইউনিয়নের বেজাচন্দ্রপাড়ার তিন যুবক মদ্যপ অবস্থায় ঘরে ঢুকে ধর্ষণ করে তাকে হত্যা করে। পরের দিন সকালে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পুলিশ তিন যুবককে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় কিশোরীর মা স্বরলেখা ত্রিপুরা তিন জনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ একই বছর ২৮ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। মামলায় ২২ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত প্রত্যেক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, মির্জাপুরে চতুর্থ শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে অপহরণের পর গলা কেটে হত্যার দায়ে তিন জনকে মৃত্যুদণ্ড, তিন জনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া প্রত্যেক আসামিকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক সাউদ হাসান এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—ঢাকার ধামরাই উপজেলার চরচৌহাট্ট গ্রামের শামছুল হকের ছেলে বাহাদুর মিয়া, একই গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে মিল্টন ও টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার সুজা?নিলজা গ্রামের বাছেদ মিয়ার ছেলে র?নি মিয়া।
আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ঢাকার ধামরাই উপজেলার চরচৌহাট্ট গ্রামের আফসার উদ্দিনের ছেলে শা?হিনুর ওরফে শাহা, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার শশধরপ?ট্টি গ্রামের মমরেজের ছেলে জ?হিরুল ইসলাম ও একই উপজেলার আমরাইল তেলিপাড়া গ্রামের শাহাদত হোসে?নের ছেলে আব্দুল মালেক।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার আমরাইল তেলিপাড়া গ্রামের জব্বার মল্লি?কের ছেলে জা?কির হোসেন, ঢাকার ধামরাই উপজেলার চরচৌহাট্ট গ্রামের আফসার উদ্দিনের ছেলে শামীম মিয়া ও একই গ্রামের তাজেল মিয়ার ছেলে আরিফ। সাজাপ্রাপ্ত ৯ আসামির মধ্যে আরিফ এখনো পলাতক রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপি খোরশেদ আলম জানান, ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি মির্জাপুর উপজেলার হাড়িয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে আসে ঢাকার ধামরাই উপজেলার চরচৌহাট্ট গ্রামের প্রবাসী দেলোয়ার হোসেনের ছেলে শাকিল (১১) ও প্রবাসী আবু বক্করের ছেলে ইমরান (১১)। আসামিরা সেখান থেকে তাদের অপহরণ করে পরিবারের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে ২৯ জানুয়ারি বিকালে মির্জাপুর উপজেলার কামারপাড়া এলাকার একটি লেবুখেত থেকে ইমরান ও শাকিলের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। তারা দুই জনই চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এ ঘটনায় নিহত শাকিলের মা জোসনা বেগম বাদী হয়ে ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মির্জাপুর থানায় মামলা করেন। পুলিশি তদন্তে ঘটনার সঙ্গে নিহতদের কয়েক জন আত্মীয় জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে আসে। পরে পুলিশ আট জনকে গ্রেফতার করলে পাঁচ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ২০১৬ সালের ৮ জুন পুলিশ ৯ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়।
