সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অপতত্পরতা রুখে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে গতকাল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জাতি পালন করল শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাংলার বিজয়ের ঊষালগ্নে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দোসরদের সহায়তায় এ দেশের যে মেধাবী সন্তানদের হত্যা করেছিল, সেই শহিদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে দেশবাসী। এদিন লাখো মানুষের স্রোত এসে মিলেছিল স্মৃতিসৌধে। আবালবৃদ্ধবনিতা শহিদ বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়ে যারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে আবারও প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার পাঁয়তারা করছে তাদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান।
গতকাল ভোর থেকেই মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ আর রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে মানুষ আসতে শুরু করে। এদিন শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন। তবে করোনা মহামারির কারণে অন্য সময়ের তুলনায় এবার সব জায়গাতেই মানুষের উপস্থিতি ছিল কম।
সোমবার সকাল ৭টা ১০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম শামিম উজ জামান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী শহিদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকষ দল সামরিক কায়দায় সালাম জানায়। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় সংসদের সার্জেন্ট এ্যাট আর্মস এম এম নাঈম রহমান। পরে প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেল আলী আকবর শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানান।
এরপর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দলের কেন্দ ীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন। এর আগে তারা ৩২ নম্বর ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যরাও এ সময় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এরপর মন্ত্রিসভার প্রতিনিধিরা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হক ভোরেই মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আসেন শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। ফুলেল শুভেচ্ছা জানান যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এরপরেই মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে সর্বস্তরের জনগণ শ্রদ্ধা জানায়।
সকালে কালো পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনাসভা, শহিদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন, শোক শোভাযাত্রা, শ্রদ্ধা নিবেদন, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হয়।
শ্রদ্ধা জানাতে আসেন শহিদ পরিবারের সন্তান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা, কেন্দ ীয় ১৪ দল, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, গণফোরাম, জাতীয় পার্টি-জাপা, জাতীয় পার্টি-জেপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শহিদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ যুবলীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ আওয়ামী মত্স্যজীবী লীগ, বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক লীগ, প্রজন্ম লীগ, মহিলা যুবলীগ, অফিসার্স ক্লাব, বাংলাদেশ এডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, হিন্দু কল্যাণ পরিষদ, হিন্দু মহাজোট, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, জাতীয় প্রেসক্লাব, বিএফইউজে, ডিইউজে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, শেখ হাসিনা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ ীয় খেলাঘর আসর, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, ঢাকা মহানগর উত্তর এবং দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের শহিদ বেদি সকাল থেকে সর্বস্তরের মানুষের ফুলে ফুলে ভরে উঠতে থাকে। প্রথমেই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। শ্রদ্ধা জানান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামান, সংসদ সদস্য সাদেক খান প্রমুখ। এরপর একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
জেপির শ্রদ্ধা
জাতীয় পার্টি-জেপির উদ্যোগে যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস উদ্যাপিত হয়। দিবসটি উদ্যাপন উপলক্ষ্যে সকাল সাড়ে ৮টায় মিরপুরে জাতীয় বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে দলের নেতৃবৃন্দ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাদেক সিদ্দিকী, মফিজুল হক বেবু, এজাজ আহমেদ মুক্তা, রুহুল আমিন, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন রেনু প্রমুখ। এছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, জাতীয় যুব সংহতির সভাপতি এনামুল ইসলাম রুবেল, সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজ আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে নেতৃবৃন্দ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে সকাল সাড়ে ৬টায় জেপির কেন্দ ীয় কার্যালয়সহ সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।
