রাজশাহীর সীমান্তবর্তী গ্রামটি গিলে খাচ্ছে পদ্মা

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:০৪

সীমান্তবর্তী গ্রাম চর খানপুর। পদ্মার নদী ভাঙ্গনে খানপুর গ্রামের বেশির ভাগ অংশ বিলীন হয়ে গেছে। এই গ্রামের সীমান্ত লাগোয়া গ্রামটির নাম কাতলামারি। গ্রামটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার অংশ। কাতলামারি গ্রামও পদ্মার ভাঙ্গনে প্রায় বিলীন। কোনো বসতবাড়ি নেই। খালি পরে আছে প্রায় ৪০/৫০ একর পতিত জমি।

কাতলামারি গ্রামের এই পতিত জমিতে বাংলাদেশের বাথান। খানপুর গ্রামের বাসিন্দারা এখানে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল লালন পালনের জন্য ছেড়ে দেয়। খানপুর গ্রামের পদ্মা নদীর মাঝখানে বিশাল চর জেগেছে। শীতকালীন এই সময়ে পদ্মার অনেক স্থানে হাঁটু পানি। ষাটোর্ধ দুলাল নদীর চর দেখিয়ে বলেন, বছর পাঁচেক আগেও ওখানে পাকা দালান ছিল। ছিল তিন তলা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দোতালা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি হাইস্কুল, মাদ্রাসা আরো কত কি।

বসতি ছিল হাজার ত্রিশেক মানুষের। পাকা দালানের বাড়িও ছিল অনেকের। মাঠে ধানের আবাদ থেকে শুরু করে শীতকালীন সবজির  চাষ হত। বাথান ছিল কয়েকটি। ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেত। প্রতি বর্ষায় উত্তাল পদ্মায় একে একে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে গত বছর খিদিরপুরের শেষ চিহ্নটুকু সীমান্ত পিলারও নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। শীতকালে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় খিদিরপুর চর দেখা মিলেছে। খিদিরপুরে আমার ৪০ বিঘা ধানি জমি ছিল। ছিল পাকা বাড়ি। সর্বস্বান্ত হয়ে আজ খানপুরে অন্যের জমিতে কুঁড়েঘর তুলে বসবাস করছি। ভাঙ্গনের যে পরিস্থিতি তাতে অআগামী বর্ষা মৌসুমে খানপুর গ্রামের টিকে থাকা বসতবাটিগুলোও বিলীন হয়ে যাবে।

রাজশাহী শহরের পদ্মা নদীর তীর থেকে ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলা সংলগ্ন খিদিরপুর ও খানপুর গ্রাম অবস্থিত। শীতকালে পদ্মা নদীতে হাঁটু পানিতে রাজশাহী শহরের সঙ্গে নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে যায়। পদ্মার ভাঙ্গনে নদীর অবস্থানের পরিবর্তনও হয়েছে। ভাঙ্গনের ফলে পদ্মা নদীর সাড়ে ৪ শ মিটার এলাকার গতিপথ পরিবর্তন হয়ে এখন নদী প্রবাহিত হচ্ছে ভারতের কাতলামারি সীমান্ত দিয়ে। খানপুর গ্রামের পদ্মা নদী দিয়ে পশ্চিম দিকে বাংলাদেশের শ্রীরামপুর গ্রাম। এখন ওই গ্রামে যেতে হলে ভারতের পদ্মা নদী দিয়ে যেতে হয়। অবশ্য শীতকালে পানি কমে গেলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। নদী উত্তাল থাকলে ভারতের অংশ ব্যবহার করতে হয় না। পদ্মা নদীর অবস্থান পরিবর্তন হওয়ায় এ সমস্যা হচ্ছে। 

বিজিবির রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, শীতকালে পদ্মার ভারতীয় অংশের সাড়ে ৪ শ মিটার জলপথ ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী ২২ ডিসেম্বর আসামের গোহাটিতে দুই দেশের মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে আলোচনা করা হবে।

শামীম নামে একজন জানান, আমরা চাষাবাদ করে যে সবজি বাজারে নিয়ে যাই, লাভের বেশি অংশ চলে যায় নৌকা বা ট্রলার ভাড়ায়। এই গ্রাম থেকে রাজশাহী শহরে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। আর এই মৌসুমে আরো সময় বেশি লাগে। পদ্মার এক অংশ ভারতের কাতলামারি গ্রামে পড়ে যাওয়ায় আধা ঘণ্টার পথ যেতে হয় তিন ঘণ্টায়। মাত্র ৪ কিলোমিটার পথ যেতে ঘুরে যেতে হয় ১৭ কিলোমিটারের বেশি পথ। এখানে যাতায়াতের ব্যবস্থা ঠিক থাকলে শহরে যাওয়ার সময় টা সহজ হয়।

আবদুল মান্নান জানান, সরকার যদি বেড়িবাঁধ করে দিত তাইলে এত ভাঙনের কবলে পড়তে হতো না। আমরা চাই আমাদের ভিটা মাটি টুকু টিকিয়ে রাখতে। আমরা চাইনা এই ভূমি বিলীন হয়ে ভারতের দিকে চলে যাক। বর্ষাকালে যে পরিমাণ ভাঙন ধরে তাতে খুব বেশি সময় লাগবেনা বিলীন হতে। এই সরকারের আগে প্রায় ২৫শ ঘর দিয়েছিল। ওই ঘর ওই বাড়ি সব বিলীন হয়ে যায়। অনেক কষ্ট আমরা বেঁচে আছি।

ইত্তেফাক/এসআই