বিজয় দিবসের স্মৃতি

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯:১০

আ মাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের মেঘালয়ে অবস্থান করছিলাম। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সরাসরি যুদ্ধ চলে মাত্র ১৩ দিন।

বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সংযোগে তৈরি হয়ে যায় যৌথ বাহিনী। এই যৌথ বাহিনীর হাতেই পতন ঘটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর। ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে যুদ্ধের।

১৩টি দিন খুব দ্রুত চলে যেতে থাকে। রণাঙ্গন থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় নতুন নতুন খবর আসে। যুদ্ধের খবরের পাশাপাশি আমাদের বিরুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের নানা অপতত্পরতার খবর আতঙ্কিত করে তোলে আমাদের। সেই সঙ্গে আছে কমিউনিস্ট চীনের সত্যতার খবর। সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদীরাই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদেরই ছিল মূল ভূমিকা। এই যুদ্ধে ভারতেরও মূল ও সক্রিয় সহযোগিতাটি এসেছিল একটা জাতীয়তাবাদী সরকারের তরফ থেকেই। তবু মুক্তিযুদ্ধের আনুপর্বিক ঘটনাধারার পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সাম্যবাদী বামপন্থিদের সক্রিয় সংযোগের মধ্য দিয়েই এ যুদ্ধ সফল পরিণতিতে পৌঁছেছিল। ৫৬ হাজার বর্গমাইল এলাকার একটি ভূখণ্ডে পাকিস্তান নামক একটি কৃত্রিম রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘটিয়ে বাংলাদেশ নামক একটি যৌক্তিক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল।

ডিসেম্বরের ১০ তারিখেই যে ময়মনসিংহ শহর মুক্ত হয়ে গেছে, সে খবর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে গিয়েছিলাম। ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের পর আর ভিনদেশে স্মরণার্থী শিবিরে বসে থাকতে পারছিলাম না। অস্থির হয়ে পড়েছিলাম মুক্ত স্বদেশের মাটি স্পর্শ করার জন্য। ১৮ কি ১৯ তারিখেই একজন সঙ্গী নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলাম। অনুভব করলাম, মানুষের অন্তরে অন্তরে বয়ে যাচ্ছে আনন্দের এক ঝরনাধারা। পরিচিত যার সঙ্গে দেখা হয়, সে-ই বুকে জড়িয়ে ধরে। ‘কেমন আছেন?’—এই প্রশ্ন কেউ জিগ্যেস করে না। চোখ বড় বড় করে শুধু বলে, ‘বেঁচে আছেন!’ পাকিস্তানি বর্বরদের সেই মারণযজ্ঞের ভেতরেও যার জানটা কেবল বেঁচে রয়েছে, সে-ই তো মহাভাগ্যবান। সে কেমন আছে সেই প্রশ্ন তখন একান্তই অবান্তর। কত প্রিয়জনের মৃত্যুর খবর শুনতে শুনতেই না হালুয়াঘাট থেকে ময়মনসিং শহর পর্যন্ত পথটুকু পাড়ি দিলাম। রাস্তার সব সেতু-কালভার্ট ভাঙা। যুদ্ধ চলার সময় এর কতগুলো ভেঙেছিলেন মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা। অবশিষ্ট ছিল যেগুলো, পাকিস্তানি সেনারা পলায়নের সময় সেগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে। কাজেই রাস্তায় কোনো মোটরযানের চলাচল নেই। পায়ে হেঁটেই পারি দিচ্ছিলাম দীর্ঘ পথ। সারা দিন পথ চলার পর সন্ধ্যা নামল সরচাপুর নামক একটি গ্রামের কাছে এসে। সেই গ্রামেই আমার সঙ্গী মহাদেব বাবুর পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাড়িতে রাত কাটালাম। শুয়ে শুয়ে রেডিওতে খবর শুনছিলাম, হঠাত্ কানে এলো এক মর্মান্তিক সংবাদ। পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের মাত্র দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর ওদের এদেশীয় দালালেরা বেশ কয়েক জন বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। এই বুদ্ধিজীবীদের বিকৃত মরদেহ পাওয়া গেছে ঢাকার রায়েরবাজার বদ্ধভূমিতে। সেই রাতে আকাশবাণীর খবরে খুব সম্ভবত মুনীর চৌধুরী, মফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, সন্তুষ ভট্টাচার্য, শহীদুল্লা কায়সার, ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. মুর্তজা এই কজন বুদ্ধিজীবীর শহিদ হওয়ার কথা শোনা গেছে। এরপর আরো কয়েক জনের নাম জানতে পারি। ডিসেম্বরের ২০ তারিখে ময়মনসিংহ শহরে এলাম। স্ত্রী-পুত্রসহ আত্মীয়দের সঙ্গে মিলিত হলাম দীর্ঘ ৯ মাস পরে।

’৭১-এ আমার বয়স ৩৫। এই বয়সেই ত্রিকালদর্শী দার্শনিক হয়ে গেলাম। ব্রিটিশ শাসনের অবসান  আর পাকিস্তানের জন্ম দর্শন করলাম। আবার দর্শন করলাম পাকিস্তানের মৃত্যু আর বাংলাদেশের জন্মও। বাংলাদেশের জন্মের খনটিতে কিন্তু মোটেই ভাবতে পারি না যে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানেই বাংলাদেশে আমাকে পাকিস্তানের ভূত দেখতে হবে।

 

লেখক : বুদ্ধিজীবী