বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে আসিয়া বহু ক্ষেত্রেই আমরা নিশ্চয়ই আত্মশ্লাঘায় ভুগিতেছি। পাকিস্তানিদের পোড়ামাটি নীতির কারণে একাত্তরে তাহারা এই দেশটিকে নির্মমভাবে ধ্বংস করিয়াছে। তাহার পর বহু রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করিলে ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা-পড়া সদ্য স্বাধীন দেশটিকে লইয়া বিশ্বের অনেক বড় বড় বিশেষজ্ঞই ঠাট্টা করিতেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি লইয়া বিশ্বব্যাংক সেই সময় বলিয়াছিল—সবচাইতে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল। এই বিষয়ে আমরা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের কথা স্মরণ করিতে পারি। গ্রন্থটির নাম—বাংলাদেশ দ্য টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট। ১৯৭৬ সালে লন্ডন হইতে নরওয়ের অর্থনীতিবিদ জাস্ট ফাল্যান্ড এবং মার্কিন অর্থনীতিবিদ জে আর পার্কিনসন এই গ্রন্থে বলিয়াছেন—বাংলাদেশ হইতেছে উন্নয়নের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। বাংলাদেশ যদি তাহার উন্নয়ন-সমস্যার সমাধান করিতে পারে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে পৃথিবীর যে কোনো দেশই উন্নতি করিতে পারিবে।
ভয়াবহ কথা! অর্থাত্, উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো খারাপ অবস্থা পৃথিবীর আর কোনো দেশের ছিল না! স্পষ্টতই ৪৯ বত্সর পূর্বে একটি ধ্বংস্তূপের উপর বঙ্গবন্ধু এই দেশটি গড়িয়া তুলিবার হারকিউলিস কাজে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন এবং তাহার দ্বিতীয় বিপ্লবটি ছিল এই দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তু তাহার সাড়ে তিন বত্সরের জমানাতেও উন্নয়নের পথের সবচাইতে বড় কাঁটা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল দুর্নীতি ও অপচয়। ইহা লইয়া বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপের সীমা ছিল না। এখন অনেকেই হয়তো বলিবেন—বিগত অর্ধশতকে অর্থনৈতিক সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি ৭৩ গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে, মাথাপিছু আয় বাড়িয়াছে ১৫ গুণ, সিংহভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসিয়াছে এবং ৭৫ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাইতেছে। শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়াছে, যদিও মান লইয়া প্রশ্ন আছে। আমরা বহু সূচকেই এই অঞ্চলের উন্নয়নের গড় হইতে উপরে রহিয়াছি। বিখ্যাত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস বহু আগেই এগারোটি ‘নিউ ইমার্জিং’ বা উদীয়মান দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করিয়াছে। কিন্তু অনেকেই এই প্রদীপের তলায় অন্ধকার দেখিতে পান। বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি ও অদক্ষতার কথা বারংবার বলা হইয়া থাকে। অনেকের মতে, এই অপচয় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, যাহা ‘সহনশীল’ মাত্রার চাইতে অনেক বেশি।
এই অপচয়ের লাগাম যদি টানিয়া ধরা যাইত, তাহা হইলে আমরা আরো ২৫ শতাংশ উন্নয়নকাজ বেশি করিতে পারিতাম! তাহা ছাড়া, বহু ক্ষেত্রেই দেশের বিভিন্ন খাতে মনোপলি ব্যাপারটি দৃশ্যমান। সুতরাং দেশ আগাইতেছে—ইহা লইয়া কাহারো মনের মধ্যে যেমন কোনো সংশয়ের অবকাশ নাই, তেমনি এই অপচয় ও দুর্নীতিও মিথ্যা নহে। সেই কারণে দেশের নির্বাহীর কণ্ঠেও আমরা প্রায়শই শুনিতে পাইতেছি—এত পরিশ্রম এবং এত কাজের পরও যদি অনিয়ম ও অপচয়ের কারণে সকল অর্জন নষ্ট হইয়া যায়, তাহা হইবে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। মনে রাখিতে হইবে, অর্থনীতির ভিতরে নীরব রক্তক্ষরণ ঘটিতে থাকিলে তাহা রাষ্ট্রের অবয়বকে ক্রমশ ফ্যাকাশে করিতে থাকে। আর বাংলাদেশে এই নীরব রক্তক্ষরণ ঘটিতেছে রাঘববোয়াল দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি ও লুটেরাদের কারণে। ব্যাংকগুলির অবস্থা কতটা খারাপ তাহা অনেকের মনেই আশঙ্কা তৈরি করে। তারল্য সংকট চরমে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় লক্ষ কোটি টাকা। সুতরাং বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের দৃষ্টি দিতে হইবে অপচয় ও দুর্নীতির দিকে। নচেত্ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করিতে পারিব না।
