’৭১-এ আজকের এই দিনে...

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৫

১৬ই ডিসেম্বর। বিজয় দিবস। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে যে ঘোর অমানিশার সূচনা হয়েছিল, তার অবসান হয়েছিল আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭১ সালে আজকের এই দিনে। একজন ক্ষমতালোভী ও উচ্চাভিলাষী মির জাফর আলি খান আর তার দোসরদের বেইমানি এই জাতির ললাটে লিখে দিয়েছিল ২০০ বছরের জন্য গোলামির জিন্দেগি। স্বাধীনতা হারিয়ে ২০০ বছর ধুঁকে ধুঁকে এ জাতিকে বুঝতে হয়েছিল স্বাধীনতার মূল্য। প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর দিনটি এ জাতির জীবনে ফিরে আসে আর নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা নামের অমূল্য রত্ন একবার হারালে ফিরে পাওয়া কত কঠিন।

ঐতিহাসিকভাবে গাঙ্গেয় বদ্বীপের এ জনগোষ্ঠী বরাবর স্বাধীনচেতা ছিল। পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের হাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের আগ পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে বেশির ভাগ সময়ে স্বাধীন রাজা-বাদশাহ কিংবা জমিদার-নবাবগণ এ অঞ্চল শাসন করেছেন। তাদের অনেকেই হয়তো বিদেশি বংশোদ্ভূত ছিলেন, কিন্তু এই দেশটাকেই নিজেদের দেশ করে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের আগে এদেশ কখনো কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়নি। ভারত বর্ষে মোগলদের প্রতাপ যখন মধ্যগগনে, তখন এ অঞ্চল বিস্তৃত মোগল সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়েছিল বটে; কিন্তু মোগল সম্রাটের প্রতিনিধিরাও এ অঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং এর সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে গেছেন, একে পররাজ্য বিবেচনা করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের মতো শোষণ করে দিল্লির কোষাগার স্ফীত করার চেষ্টা করেননি।

তবে, এ জাতি পরাধীনতাকে কখনই সহজে মেনে নেয়নি। কখনো পরাধীন হলেও যখনই সুযোগ এসেছে, বিদ্রোহ করেছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। আঠারো শতকের শেষের দিকে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, উনিশ শতকের প্রথম ভাগে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা আন্দোলন ও  হাজি শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন, ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, বিশ শতকের শুরুতে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন—এসবই এ জনগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতি তাদের ধূমায়িত অসন্তোষ ও স্বাধীনতার স্পৃহাকে বারবার পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে ধরেছে। হয়তো-বা সফলতা আসেনি, কিন্তু জনতার মননে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার স্পৃহাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রজ্বলিত রাখতে এসব আন্দোলন-সংগ্রাম ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে গেছে।

এ বিজয় হয়তো অত সহজ হতো না, যদি না সেদিন ভারতের মতো একটি বৃহত্ প্রতিবেশী অকাতরে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসত। শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে, বিশ্বময় আমাদের পক্ষে জনমত গঠন করে এবং যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে, সেদিন ভারত আমাদের পক্ষে যে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছিল, তার তুলনা সত্যিই বিরল। সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চায়নার মতো সেদিন যারা আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তাদের অনেকেই আজ আমাদের বন্ধু। এটা বঙ্গবন্ধুর উদারতা ও ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’—নীতির ফসল। কিন্তু পাকিস্তান? বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানিরা ’৭১-এ ভূভাগের জনতার ওপর যে চণ্ডনীতি চালিয়েছিল, সেজন্য কি তাদের মধ্যে কোনো রূপ অনুশোচনা জেগেছে?

n লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়