১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল তাণ্ডব যে সব অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলে তার মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানা অন্যতম। এ অঞ্চলে সহজ-সরল মানুষগুলো বুঝে ওঠার আগেই গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হিন্দু পরিবারগুলো অত্যাচারের শিকার হয় বেশি। ফুলবাড়িয়া শহরের ঋষিপাড়ায় চলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। অত্যন্ত নিম্নবিত্ত শ্রেণির খুবই সাধারণ জীবনযাপনকারী মানুষগুলোর ওপর রাজাকার আলবদররা পাশবিক নির্যাতন চালায়।
বীরাঙ্গনা গীতা রানী ঋষি এসব ঘটনার সাক্ষী। তার বাবার নাম রামচরণ ঋষি। ফুলবাড়িয়া সদরের ঋষিপাড়াতেই তাদের আদিবাস। তারা বংশপরম্পরায় জুতা সেলাই করে জীবিকানির্বাহ করে। গীতা রানী ঋষি তখন বিবাহিত। বিয়ের বয়স তিন বছর। ১০-১১ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। সরাসরি আলাপচারিতার সুযোগ হয় গীতা রানীর সঙ্গে। তিনি এখন আর সঠিক বলতে পারেন না মুক্তিযুদ্ধের সময় কী কী ঘটেছে তার জীবনে। অস্পষ্ট হয়ে গেছে তার সেই কিশোরী বয়সের স্মৃতি। তার মনে আছে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তিনি তার বাবার বাড়িতে থাকতেন। তার স্বামীর নাম ছিল খোকা চন্দ্র ঋষি। গাবতলী কড়ইতলা তার বাড়ি। যুদ্ধের সময় তিনি জোয়ান তাগড়া। যুদ্ধের আমেজে চারদিকে হইচই। তিনিও নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারেননি। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কোথাও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর লোকজন ঢুকেছে জানতে পারলে প্রতিহত করতে লড়াইয়ে নামতেন খোকা চন্দ্র ঋষি। কত রকম ঝুঁকি নিয়েছেন বয়সের উন্মত্ততায়।
গীতা রানী ঋষি এ সব ঘটনার সাক্ষী। তার ভাষ্য অনুযায়ী গুলির শব্দ বন্ধ হলে তারা নদীর পাড়ে ছুটে যেতেন। নদীর পাড়ে গিয়ে দেখেন শুধুুু রক্ত আর রক্ত! মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা এবাড়ি-ওবাড়ি পালিয়ে বেড়িয়েছে। পাটখেতের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে দিন কেটেছে মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের। গীতা রানী তার বাবার বাড়িতে থেকেই সবকিছু দেখেছেন এবং শুনেছেন। যুদ্ধের সময় কত হাহাকার। কাজকর্ম নেই, ঘরে খাবার নেই। কার কাছে খাবার চাইবে। সবারই অনিশ্চিত জীবন। কারো কাছে হাত পেতে তো লাভ নেই। খেয়ে না খেয়ে হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে বাঁচতে হয়েছে সবাইকে।
গীতা রানী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে কথা মনে করে বলেন—‘কত্তো চিক্কার পারছি ভাতের লাইগা। খাওনের কষ্টে কত্তো কানছি। শ্বশুরবাড়িতে যুদ্ধের সময় খাওনের কোনো উপায় আছিল না। কচুশাক লতাপাতা সিদ্ধ কইরা খাইছি। হেরপর খিদার কষ্টে না পাইয়া বাপের বাড়ি আইয়া পড়ছি।’
গীতার বাবার বাড়িতে তখন তিন বোন তিন ভাই। যুদ্ধের সময় সবাই ছোট। সাত-আট বছর। অভাবের সংসারে নানা রকম টানাটানি। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। তার মধ্যে মাথার ওপর মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ। জীবনের মায়ায় হাত গুটিয়ে বসে থাকারও উপায় নেই। কাজের সন্ধানে বাইরে যাবে সেটাও সম্ভব নয়। দুর্বিসহ করুণ পরিণতি। আশপাশে কিছু বিহারি পরিবার ছিল। তারা পাকিস্তানিদের হিন্দুবাড়ি দেখিয়ে দিত। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হতো তাদের।
এক বৃষ্টির রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গীতাদের বাড়িতেও ঢোকে। তেমন কিছু তো ছিল না তবু সবকিছুতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর দুইজন পাকিস্তানি গীতাকে একলা ঘরে পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। গীতা রানীর সঙ্গে যখন কথা বলি তখন তিনি লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন।
বললেন—‘মা গো হেই কতা কি কওন যায়? কওন যায় না মা। মুক খুলুন যায় না। আমার ওপরে যে অন্যায় অবিচার জুলুম করছে হেইড্যা কেউরে কওন যায় না।’
গীতা রানী ঋষি শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন। আর কিছুই বলতে পারলেন না। আমি আর শুনতেও চাইনি। পোড়া ক্ষত কী করে শুকায়। এই ক্ষত বুকে নিয়ে এতটা বছর!
এসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন করতে পারাটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এই বিষয়টি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শতশত বীরাঙ্গনা যারা আত্মপরিচয় নিয়ে পরিবারে ফিরতে পারেননি বঙ্গবন্ধু তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন, বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছেন। সব বীরাঙ্গনাকে নিজের কন্যার মর্যাদা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তাদের সামাজিক অবস্থান নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালে এসব বীরাঙ্গনাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা খেতাবে ভূষিত করে তাদেরকে সঠিক সম্মান ও মর্যাদায় আসীন করেছেন। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা বীরাঙ্গনা জননীদের হারিয়ে যাওয়া সম্মান বহুগুণে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
n লেখক :অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
