ধর্মের নামে বিশৃঙ্খলা করতে দেব না

মেহেদী হাসান

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:১৫

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্ম নিয়ে বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এ দেশে ধর্মের নামে আমরা কোনো ধরনের বিভেদ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেব না। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করবেন না। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, ধর্মান্ধ নয়। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রাখেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সব ধর্মের-বর্ণের মানুষের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে এ দেশের মানুষ প্রগতি, অগ্রগতি এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবেন। মহান বিজয় দিবস-২০২০ উপলক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। 

শেখ হাসিনা বলেন, ‘একাত্তরের পরাজিত শক্তির একটি অংশ মিথ্যা, বানোয়াট, মনগড়া বক্তব্য দিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে ইদানীং মাঠে নেমেছে। সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। জাতির পিতা ১৯৭২ সালে বলেছিলেন, ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার না করতে। কিন্তু পরাজিত শক্তির দোসররা দেশকে আবার ৫০ বছর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। রাজনৈতিক মদদে সরকারকে ভ্রুকুটি দেখানোর পর্যন্ত ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বাংলাদেশ লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, জীবনানন্দের বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশ শাহজালাল, শাহ পরান, শাহ মকদুম, খান জাহান আলীর বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ; সাড়ে ষোল কোটি বাঙালির বাংলাদেশ। এ দেশ সকলের।’

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনের মধ্যে যখন তার ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা হচ্ছে, তখন মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার প্রত্যয় আবার উচ্চারিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিজয় দিবসের প্রাক্কালে আসুন, আবারও আমরা শপথ নেই— আমরা যেন লাখো শহিদের রক্তের ঋণ ভুলে না যাই। আমরা যেন মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ভূলুণ্ঠিত হতে না দেই।’ যুবশক্তি, তরুণ সমাজ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অনুরোধ, তোমরা তোমাদের পূর্বসূরিদের আত্মোত্সর্গের কথা কখনই ভুলে যেও না। তাদের উপহার দেওয়া লাল-সবুজ পতাকার অসম্মান হতে দিও না। যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদের বিজয়-নিশান সমুন্নত রাখার শপথ নাও এই বিজয় দিবসে। প্রতিজ্ঞা কর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এদেশকে সোনার বাংলাদেশে পরিণত করবে। তবেই ৩০ লাখ শহিদের আত্মা শান্তি পাবে। জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ হবে। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বর্বর বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের ইতিহাস প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে তুলে ধরেন। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত, দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, তখনই পরাজিত শক্তির দোসররা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কীভাবে তাকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, সে কথাও মনে করিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে শুধু একজন ব্যক্তি মুজিবের মহাপ্রয়াণ হয়নি। তাকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস চালানো হয়; বাঙালি জাতির যে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছিল, তা স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।’

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের শুরুতেই দেশের সব নাগরিককে মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে আজ আমরা বিজয় দিবস-২০২০ উদ্যাপন করতে যাচ্ছি। এ বছর আমরা আমাদের মহান নেতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন করছি। কয়েক দিন পর আমরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে পদার্পণ করব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছি। গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমরা করোনা ভাইরাস মহামারি মোকাবিলা করে সমগ্র বিশ্বের বুকে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছি। প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে নিজেদের অর্থায়নে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে দেশের দুই প্রান্তকে সংযুক্ত করেছে। জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পৃথিবীর বুকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার প্রত্যয় নিয়ে দেশ এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশের সকল নাগরিককে আমি বিজয় দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদ এবং ২ লাখ নির্যাতিত মা-বোনের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ‘সশ্রদ্ধ সালাম’ জানান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে নিহত পরিবারের সদস্যদের কথাও প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করে বলেন, আজকের এই মহান দিনে আমি মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাদানকারী বিভিন্ন দেশ ও দেশের জনগণ, ব্যক্তি এবং সংগঠনের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

করোনা ভাইরাসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে এ বছর যে সব রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, বরেণ্য ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের মানুষ মারা গেছেন, তাদের সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা সময়োচিত পদক্ষেপ এবং কর্মসূচি গ্রহণ করে মহামারির এই নেতিবাচক অভিঘাত কিছুটা হলেও সামাল দিতে সক্ষম হয়েছি।  বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রক্ষেপণ বলছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি হবে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ আজ একটি ‘সমীহের নাম’। আজকের বাংলাদেশ আর অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর বাংলাদেশ নয়। আজকের বাংলাদেশ স্বাবলম্বী বাংলাদেশ। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। তবেই ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের উন্নত, সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে।’

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের শেষাংশে বিদ্রোহী কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলেন- ‘চাহি না জানতে- বাঁচিবে অথবা মরিবে তুমি এ পথে, এ পতাকা বয়ে চলিতে হইবে বিপুল ভবিষ্যতে’। সবাইকে আবারও মহান বিজয় দিবসের বর্ণিল শুভেচ্ছা। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।