একটি সম্ভাবনাময় নাট্যকাণ্ড
শা মী ম সা গ র
নাটক শুরুর তৃতীয় ঘণ্টাটি বাজতেই মধ্য মঞ্চে পরস্পর বিপরীত অবস্থানে দুটি চরিত্রকে দেখা যায়; একজন পুরুষ এবং একজন নারী; কনটেম্পোরারি ক্রিয়েটিভ নাচের মুদ্রায় প্রতীকী কোনো পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলেন তারা। বোঝা যায় যে, নাটকের কাহিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই মঞ্চে ঘটবে তারই একটা আভাস দিয়ে গেল তারা। এই প্রাক-কথনেই নির্দেশক বুঝিয়ে দেন, তিনি দর্শকের চিন্তার জগতে নাড়া দেওয়ার মতো নাট্য পরিবেশনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেটার প্রতিফলনও পেয়ে যাই আমরা পরবর্তী অংশে। রেহানে জাবারি নামের মেয়েটির ফাঁসি অনুষ্ঠিত হয়, জল্লাদ এসে তার মাথায় কালো কাপড় পরাতে চাইলে অস্বীকৃতি জানায় রেহানে; বলে ওঠে, ‘যে মৃত্যু কাঙ্ক্ষিত নয়, তাকে লুকিয়ে বরণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। চিত্ত দুর্বল হয় অপরাধীর। সত্যকে কখনো কালো কাপড়ে ঢেকে রাখা যায় না।’ ফাঁসিকাণ্ডের পরক্ষণেই মৃত্যুলোকে উপস্থিত হয় সে এবং সেখানেও বিচারকের সম্মুখীন সে পুনর্বার; এবং পুনর্বার তার জীবনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি বর্ণনা করে যেতে হয়। অনন্তকাল ধরে ঝুলে থাকা পারলৌকিক জীবনে ঘটিত বিচারকার্যে রেহানে জাবারি নামের মেয়েটির বয়ানে আমরা মূল নাট্যকাণ্ডে প্রবেশ করি।
ইরানী এক ছোট্ট ছিমছাম পরিবারে মা শোলেহ আর মেয়ে রেহানের সুখের পৃথিবী। ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজের জন্য একটি সাইটে যেয়ে সারাবান্দি নামের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার দ্বারা ধর্ষণের শিকার হতে হতেও বেঁচে যায় রেহানে। ধর্ষণ থেকে বাঁচতে সারাবান্দিকে হত্যা করতে বাধ্য হয় সে। এরপরই রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেকে পরিচ্ছন্ন প্রমাণ করতে নির্দোষ রেহানের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। সমস্ত পৃথিবী রেহানে জাবারির পক্ষে মানবিক—তবুও রাষ্ট্র বড়ই একগুঁয়ে, নিজেকে পরিচ্ছন্ন প্রমাণে সচেষ্ট, আর তাই তো বিচারে ফাঁসিই নির্ধারিত হয়; রেহানের ফাঁসি হয়ে যায়।
রেহানের ফাঁসির পর পুনরায় মঞ্চে প্রথম দৃশ্যের চরিত্রেরা উপস্থিত। রেহানের প্রশ্নের জবাবে বিচারক বলেন, ‘সামাজিক অসুস্থতা, রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতার জন্য সমাজের চলমান দূরাবস্থা দূর করতে হলে নিজেকে বদলাতে হবে।’ রেহানে বিচারকের এই স্টেটমেন্ট গ্রহণ করতে পারে না, বলে ওঠে, ‘অবজেকশন’; বিচারক তার গলা চড়িয়ে রেহানের কণ্ঠকে দমিয়ে দেন এই বলে— ‘অবজেকশন ওভাররুলড’।
নাটকটির নাট্যকার এবং নির্দেশক মাহাবুব আলম। রচনা এবং প্রয়োগে রেহানে জাবারির ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় রাজনীতি, সামাজিক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিষয়টিকেও মিশিয়ে দিয়েছেন। আর সেজন্যই ‘অবজেকশন ওভাররুলড’ নাটকটির ঘটনা ইরানের হলেও বৈশ্বিক হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে বাংলাদেশেরই।
নাট্যকার মাহাবুব আলম নাটকটি রচনার ক্ষেত্রে বেশ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। মূলত রেহানে জাবারি জেলখানায় থেকে মায়ের কাছে একটি চিঠি লেখে, সেই চিঠিকে উপজীব্য করেই পুরো নাটকটি রচিত হয়েছে। রেহানের ঘটনার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে ছাত্র বলাত্কার, নারী নির্যাতন, জনগণের বিপক্ষে রাষ্ট্রের অবস্থানের মতো বিষয়গুলোও চমত্কার করে গেঁথে দিয়েছেন মূল নাট্যঘটনার শরীরে। প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্দেশক মাহাবুব আলম মিশ্র রীতি গ্রহণ করেছেন, এবং এর সুপ্রোয়গ ঘটিয়েছেন।
নাটকের সার্থকতা তখনই হয় যখন দর্শকেরা নাটকটিকে গ্রহণ করে, নাট্যকা্লের পুরো সময়টাতে দর্শকাসনে বসেও মঞ্চে উপস্থাপিত ঘটনার সহযাত্রী হয়ে যান। অবজেকশন ওভাররুলড নাটকটির মঞ্চে পরিবেশনার শেষে সাধারণ দর্শক বলে ওঠেন, এ তো আমাদের দেশেরই ঘটনা; দর্শক ভাবিত হন, দর্শক নিজের দিকে ফিরে দেখেন, নিজের অবস্থানটা নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। আর তখনই নাটকটির সফলতা প্রমাণিত হয়ে যায়। নাট্যগল্প আর নাট্যঘটনার একটা টানটান ভাব রয়েছে, আকর্ষণ ক্ষমতা রয়েছে, যা দর্শককে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য মাহাবুব আলমকে সার্থকই বলা যায়।
নাটকটি মঞ্চে এনেছে অনুরাগ থিয়েটার। পাঁচ বছরে পা রাখা নাট্যদলটির প্রতিষ্ঠাতা যারা তারা একসময় সৌখিন নাট্যচর্চায় যুক্ত থাকলেও বাংলাদেশের চলমান গ্রুপ থিয়েটার চর্চার সঙ্গে একাত্ম হতে এবং একই সঙ্গে পথ চলতেই দলটির প্রতিষ্ঠা করেছেন ২০১৬ সালে। অবজেকশন ওভাররুলড নাটকটির মাধ্যমে নাট্যদলটি নতুন করে পথ চলা শুরু করল।
