রপ্তানির জন্য কাঁচামাল কিংবা অন্যান্য এক্সেসরিজ আমদানির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বন্ড লাইসেন্স নেওয়ার শর্ত রয়েছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বন্ড লাইসেন্স নেওয়ার যুক্তি থাকলেও স্থানীয়ভাবে ক্রয়ের ক্ষেত্রে এর যৌক্তিকতা নেই। এর ফলে বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, বাড়ছে হয়রানিও। সার্বিকভাবে এটি ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে অন্তরায়। সেই সঙ্গে এই শর্ত স্থানীয় শিল্পের পণ্য ক্রয়ও নিরুত্সাহিত করছে। এই ব্যবস্থা বাতিলের দাবি জানিয়ে সম্প্রতি তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বস্ত্রশিল্প মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ ও টেরিটাওয়েল রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিটিটিএলএমইএ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। ইস্যুটি তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক বিভাগকেও জানিয়েছে।
অবশ্য এ বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে শুল্ক বিভাগের। তারা বলছেন, স্থানীয়ভাবে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রেও যেহেতু ঐ ক্রয় দেখিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে থাকে, সেজন্য এটি তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে শুরু করে। এরপর ৯০ দশকের পর থেকে তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ঐ সময় তৈরি পোশাকের কাঁচামাল হিসেবে কাপড় ও অন্যান্য এক্সেসরিজের প্রায় সবই আমদানিনির্ভর ছিল। এসব কাঁচামাল বাণিজ্যিকভাবে আমদানিতে বড় অঙ্কের শুল্ককর পরিশোধ করতে হতো। রপ্তানিকারকদের এই শুল্কের ভার থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য জন্য বন্ড লাইসেন্স ব্যবস্থার প্রবর্তন করে সরকার। অর্থাত্ রপ্তানির কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা যাবে। তবে শর্ত হলো, ঐ কাঁচামাল নির্দিষ্ট গুদামে রেখে তা দিয়ে তৈরি পণ্যের পুরোটাই রপ্তানি করতে হবে। এটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ বা বন্ড সুবিধা নামে পরিচিত। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল যদি স্থানীয়ভাবে বিক্রি করতে হয়, সেক্ষেত্রে সরকারের প্রযোজ্য সব ধরনের শুল্ককর পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, মূল রপ্তানি ঋণপত্রের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রায় স্থানীয় ব্যাক টু ব্যাক (ঋণপত্রের বিপরীতে ঋণপত্র) খোলার ক্ষেত্রেও বন্ড লাইসেন্স নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে যেহেতু কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে বেশির ভাগ কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে এই বন্ড লাইসেন্সের শর্ত দেওয়া অযৌক্তিক।
চিঠিতে বলা হয়, এই নীতিমালার কারণে বিভিন্ন ব্যাংক বন্ড লাইসেন্সবিহীন ওভেন, নিটওয়্যার, টেরিটাওয়েল, হোমটেক্সটাইল ও অন্যান্য বস্ত্রজাত সামগ্রী উত্পাদন ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি ঋণপত্রের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রায় স্থানীয় ব্যাক টু ব্যাক ঋণ প্রদান করতে চাইছে না। একজন রপ্তানিকারকের রপ্তানির ঋণপত্রের বিপরীতে স্থানীয় সূত্র থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ, বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ, যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বন্ড লাইসেন্সের আবশ্যকতা বাতিলের দাবি অনুরোধ জানান তারা।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে বন্ড লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা হয়রানি ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকার ব্যবসা সহজ করতে চাইছে অথচ এই নীতিমালার মাধ্যমে ব্যবসাকে কঠিন করা হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় সূত্র থেকে কাঁচামাল ক্রয়ে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে।
তবে ঢাকা কাস্টম বন্ড কমিশনারেটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, এসব ক্রয়ের বিপরীতে উত্পাদনকারী সমপরিমাণ একই পরিমাণ পণ্যের কাঁচামাল (যেহেতু রপ্তানি হয়েছে) শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করেন। এক্ষেত্রে তদারকি না থাকলে অনিয়মের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি হবে। ফলে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাবে, অন্যদিকে শুল্ক পরিশোধ করে আনা বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন।
অবশ্য এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন বিটিটিএলএমইএর সভাপতি সাহাদাত হোসেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় এমন অনিয়ম সম্ভব নয়। ১০০ কেজি কাঁচামাল ক্রয় হলে ১০০ কেজি দিয়েই তৈরি পণ্য রপ্তানি করতে হয়। ভ্যাট চালান, ইনভয়েস, ইএক্সপি, প্যাকিং লিস্ট, ইআরসি (রপ্তানির সনদ), পিআরসি (রপ্তানিকৃত পণ্যের অর্থ প্রত্যাবাসন), সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সনদ, অডিট ফার্মের সনদসহ আরো বেশকিছু ডকুমেন্ট নগদ সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দিতে হয়। ফলে অনিয়মের সুযোগ নেই। বরং বন্ড লাইসেন্স নেওয়ার শর্ত দেওয়ার মাধ্যমে বাড়তি হয়রানির সুযোগ থাকে বলে দাবি করেন তিনি।
