ইংরেজি ‘ইনস্টিটিউশনালাইজেশন’ শব্দটির বাংলা করা হয় ‘প্রাতিষ্ঠানিকতা’। আসলে ঐ প্রত্যয় দ্বারা ইংরেজি ও ইংরেজির জগত্ পাশ্চাত্যে যা বোঝানো হয়, বাংলা প্রতিশব্দে তার সবটুকুর যেন প্রকাশ ঘটে না। ইনস্টিটিউশনালাইজেশন দ্বারা নিয়মাতন্ত্রিকতা, স্থায়িত্ব, বাধ্যবাধকতা, গ্রহণযোগ্যতা, ধোপে টিকে যাওয়া ইত্যাদি বোঝানো হয়। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের ফার্স্ট কান্ট্রির ফার্স্ট পারসন যখন তৃতীয় বিশ্বের থার্ডক্লাস লোকের আচরণ করছিলেন, তখন আমাদের অনেক আন্তর্জাতিক ভাষ্যকার বলছিলেন, ‘ট্রাম্প টিকে যাবেন’। নির্বাচন-উত্তর কোনো এক টকশোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইনস্টিটিউশনালাইজেশনের ওপর নির্ভর করে আমার মতো কেউ কেউ বলেছিল, ‘ট্রাম্প উতরে যাবেন’। তাদের যুক্তি ছিল ‘ক্ষমতা বলে কথা’। ট্রাম্প ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট। ‘হি ক্যান ডু অ্যান্ড আনডু এনিথিং অ্যান্ড এভরিথিং’। এটা অস্বীকার করা যায় না যে সমসাময়িক বিশ্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন সর্বময় ক্ষমতাধারীদের প্রথম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ইলেকটেড ডিকটেটরশিপ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার জার বা ভারতের মোগল সম্রাটের চেয়েও শক্তিশালী—এরকম উদাহরণ দেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ। এমনি ক্ষমতাধারী ব্যক্তি ক্ষমতায় মদমত্ত হবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতার সেই রশি টেনে ধরার জন্য রয়েছে সাংবিধানিক ব্যবস্থা। মার্কিন আইনসভা ‘কংগ্রেস’-এর কাছে জবাবদিহি করতে হয় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। মার্কিন শাসনব্যবস্থার সুউচ্চে স্থাপিত সুপ্রিম কোর্ট। প্রেসিডেন্টের যে কোনো অধ্যাদেশ ও আদেশকে নাকচ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে সুপ্রিম কোর্ট। তাছাড়া শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা নিয়মতান্ত্রিকতার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কাছে মার্কিন শাসনব্যবস্থা সমর্পিত। আইন ও আনুষ্ঠানিকতা মার্কিন নাগরিকদের জীবনকে নিয়তই নিয়ন্ত্রণ করে। তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ এবং খোদ হোয়াইট হাউজ আইন ও নিয়মাতান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে না। সুতরাং একজন ক্ষমতায় মত্ত ট্রাম্পকে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ রক্ষা করেই চলতে হয়।
ট্রাম্প নির্বাচনি যুদ্ধ থেকেই টের পেয়েছেন গোটা জাতি ত্যক্ত, বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়েছে তার অনিয়মাতান্ত্রিকতা, অসদাচরণে এবং অরাজকতায়। সুতরাং তৃতীয় বিশ্বের নেতা-নেত্রীদের মতো আগে থেকেই ভোট কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করে গণ্ডোগল বাধানোর ক্ষেত্র তৈরি করেন। যখন সত্যি সত্যি মার্কিন জনগণ তাকে লাল কার্ড দেখাল, তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই হোয়াইট হাউজের কর্তৃত্ব ব্যবহার করে চ্যালেঞ্জ করলেন নির্বাচনব্যবস্থাকে।
দীর্ঘ ও জটিল এই নির্বাচনের ফলাফল ইতিমধ্যে সবারই জানা। তবে আনুষ্ঠানিকতার বাধ্যবাধকতা এখনো শেষ হয়নি। গৃহীত ও ঘোষিত নির্বাচনি ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকমণ্ডলী কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। বিগত ১৪ ডিসেম্বর ছিল এই আনুষ্ঠানিকতার দিন। এর আগে প্রতিটি স্টেট পৃথক পৃথকভাবে তাদের নির্বাচনি ফলাফল সত্যায়ন করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। ফেডারেল আইনে সময় নির্দিষ্ট না করায় একেক জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভোট হয়। ইলেকটোরালরা সাধারণত ইতিমধ্যে সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে বিরোধী ভোট দেন না। ফেডারেল আইন অনুযায়ী সব রাজ্যের ইলেকটোরালরা ইতিমধ্যে বিজয় অর্জিত হলেও কোন নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য নন। ৩২টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলোম্বিয়ায় নির্দিষ্ট প্রার্থীকেই ভোট দিতে বাধ্য ইলেকটররা। যিনি পপুলার ভোটে জিতবেন, তাকেই ভোট দিতে হবে তাদের। বেশির ভাগ রাজ্যেই নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট না দিলে ইলেকটরদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তির বিধান নেই। মাত্র পাঁচটি রাজ্যে শাস্তির আইন আছে। গৃহীত ভোটের ফলাফল কংগ্রেস ও ন্যাশনাল আর্কাইভে পাঠানো হবে। ৬ জানুয়ারি দুপুর ১টায় কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন বসবে। এই যৌথ অধিবেশনে ৩ নভেম্বরে নির্বাচনি ফলাফল এবং আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ ইলেকটর কলেজের ফলাফল চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। ট্রাম্প সেটাকেই হয়তো ট্রাম্পকার্ড মনে করছেন।
সংবিধানের ফাঁকফোকর দিয়ে তিনি নির্বাচনি ফলাফল বাতিলের ছক এঁকেছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় ইলেকটোরাল কলেজ ভোটকে মামলার মাধ্যমে নাকচ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন ট্রাম্পপক্ষ। টেক্সাসের এটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। এতে তিনি জর্জিয়া, মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া এবং উইসকনসিনের লাখ লাখ ভোট বাতিলের দাবি করেন। উল্লেখ্য যে, জো বাইডেন এগুলোর সব ভোট পেয়েছেন। মামলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ ১৯টি স্টেটের এটর্নি জেনারেল এবং কংগ্রেসের ১২৭ জন রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থন ছিল। দৃশ্যত সংখ্যা এবং অবস্থানটি শক্ত ছিল; কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি খারিজ করে দেয়। এই আদেশ ট্রাম্পের জন্য একটি বিরাট পরাজয়। এর আগে নির্বাচনের সময় কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তিনি বলেছিলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। এর আগে পেনসিলভেনিয়াতে জো বাইডেনের বিরুদ্ধে করা আরেকটি মামলা খারিজ করেছিল আদালত। নির্বাচনের পর থেকেই ট্রাম্প এবং তার সমর্থকরা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কয়েক ডজন মামলা করেছিল; কিন্তু কোনোটিতেই তারা জয়লাভ করতে পারেনি। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেন রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পকে ৩০৬-২৩২ ইলেকটোরাল ভোটে হারিয়ে দেন। বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে ৭০ লাখ ভোট বেশি পান। বিস্ময়ের ব্যাপার—ট্রাম্প পরাজিত হলেও বিপুলসংখ্যক ভোটের অধিকারী হন। নির্বাচনি ফলাফল অস্বীকার করার শক্তি—তিনি এই প্রাপ্ত ভোট থেকে লাভ করেছেন বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। জনপ্রিয়তার এই ভিত্তি ট্রাম্পকে অতি উচ্চাভিলাষী এবং অতিরিক্ত আস্থাবান করেছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আতঙ্কিত যে, ট্রাম্প প্রাপ্ত এই জনসংখ্যা বা জন আস্থা ভবিষ্যত্ মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। যা হোক, সুপ্রিম কোর্টের ফলাফলে ফিরে আসি। ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের ওপর শেষ ভরসা করেছিলেন। মামলা দায়েরের আগে তিনি বলেছিলেন: সুপ্রিম কোর্ট যদি বিজ্ঞতা ও সাহসের পরিচয় দেয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে। মার্কিনিরা ভোটাধিকার ফিরে পাবে। সুপ্রিম কোর্টের ওপর কেন এতটা ভরসা করেছিলেন ট্রাম্প তাও সবাই জানেন। এটা এখন একটি ওপেন সিক্রেট বিষয়। সুপ্রিম কোর্টে ৯ জন বিচারপতি আছেন। এর মধ্যে ছয় জনই রক্ষণশীল। এদের মধ্যে তিন জন ট্রাম্পের হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত। তাই তারা ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছিলেন। নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একরকম তড়িঘড়ি করে অ্যানি কোনি ব্যারেটকে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। নবনিযুক্ত বিচারপতি রক্ষণশীল হিসেবে নিজের পরিচয় দেন। নিয়োগটি যে স্পষ্টতই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেটি তখনই বোঝা যাচ্ছিল। এখন বিচারকদের আচরণে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প। তিনি লিখেছেন: সুপ্রিম কোর্টের রায় তাদেরকে হতাশ করেছে। সেখানে প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার বালাই নেই। মার্কিনিরা প্রতারিত হয়েছেন। আমাদের দেশকে অসম্মানিত করা হয়েছে। আসলে ট্রাম্প ভুলে গিয়েছিলেন যে, আইন বা আইনের ব্যাখ্যা ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কারণ হতে পারে না। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইন সবার জন্য সমান। নিবন্ধের প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুপ্রিম কোর্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতীক। ন্যায় বিচারের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান। সংবিধান বা আইনের মাধ্যমে যে নিয়মতান্ত্রিকতা অর্জিত হয় বা অর্জিত হয়ে আসছে তার বিপরীত করার কোনো অবকাশ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত সেই ইনস্টিটিউশনালাইজেশনকেই প্রমাণিত করেছে।
এতকিছুর পরেও ট্রাম্পের হুমকি-ধমকি থেমে নেই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেটে ভেটো দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে এক টুইট বার্তায় তিনি এ হুমকির জানান দেন। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হয়েছে সামরিক বাজেট বিল। কংগ্রেসের উভয়কক্ষ—সিনেট ও হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে যথারীতি অনুমোদিত হয়েছে এই বাজেট বিল। কংগ্রেসে বিল পাশ হলেও প্রেসিডেন্টের বিশেষ ভেটো প্রয়োগ করবেন ট্রাম্প বিলটি নাকচ করতে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাজেটে ভেটো দিয়ে আরো একবার নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দিতে চাইছেন। ব্যক্তি হিসেবে তিনি যে নিয়মতান্ত্রিক নয় এই ভেটো দেওয়ার ইচ্ছা থেকে তা আর একবার প্রমাণিত হলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প ভেটো দিলেও তা গ্রহণযোগ্য না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ভোটে বিলটি পাশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ভাষায় একে বলা হয় সুপার মেজরিটি। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্টের ভেটো কোনো কাজে আসে না।
মার্কিন প্রেসিডেনসি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি প্রথা এবং একটি নিয়মতান্ত্রিকতা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিভূ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে দেখতে অভ্যস্ত সারা দুনিয়ার মানুষ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত অবস্থান, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বিরূপ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে মার্কিন প্রেসিডেনসির যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি করেছেন। বিশেষ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এবং গণতন্ত্র অনুশীলনের ক্ষেত্রে যেভাবে মার্কিনিরা জোরেশোরে কথা বলতেন ট্রাম্পের কারণে সে কণ্ঠস্বর একটু নিচু হয়েছে বইকি। বিশ্ববাসী ট্রাম্পের পরাজয়ে স্বস্তি বোধ করছে। জো বাইডেনের বিজয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে বলে সবারই আশাবাদ।
n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
